ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সমবায়: জনকল্যাণের এক অনন্য দর্শন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৬ বার
ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সমবায়: জনকল্যাণের এক অনন্য দর্শন

প্রকাশ: ০৪ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানবসভ্যতা ও সমাজ বিকাশের ইতিহাসে পারস্পরিক সহযোগিতা একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। মানুষ স্বভাবগতভাবেই সামাজিক জীব এবং একার পক্ষে জীবনের প্রতিটি চাহিদা পূরণ করা অসম্ভব। এই পারস্পরিক সহযোগিতা, অংশীদারি এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই পৃথিবীর বুকে মানুষের পথচলা সহজতর হয়েছে। আধুনিক অর্থনৈতিক পরিভাষায় যাকে আমরা ‘সমবায় সমিতি’ বা কো-অপারেটিভ সোসাইটি হিসেবে চিনি, ইসলাম সেই ধারণাকে এক উচ্চতর ও মানবিক ভিত্তি প্রদান করেছে। ইসলামে সমবায়ের ধারণা কোনো আধুনিক উদ্ভাবন নয়, বরং এটি কোরআন ও সুন্নাহর মৌলিক দর্শনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদিও ইসলামী পরিভাষায় সরাসরি ‘সমবায় সমিতি’ শব্দটি প্রাচীন ফিকহ শাস্ত্রে ব্যবহৃত হয়নি, তবে এর মূল নির্যাস তথা পারস্পরিক সহযোগিতা, ন্যায়ভিত্তিক অংশীদারি, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করার নির্দেশ প্রতিটি পর্যায়ে বিদ্যমান।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতিকে পারস্পরিক সহযোগিতার নির্দেশ দিতে গিয়ে বলেছেন যে, তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো, কিন্তু পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা কোরো না। এই একটি আয়াতেই ইসলামী সমবায়ের মূল ভিত্তি ও সীমারেখা নির্ধারিত হয়ে গেছে। যেকোনো যৌথ উদ্যোগের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হতে হবে জনকল্যাণ, ন্যায়বিচার ও আল্লাহভীতি। কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যদি অন্যায্য হয়, যাতে সুদ, প্রতারণা কিংবা মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে সেই কর্মকাণ্ডে ইসলাম কোনোভাবেই সম্মতি দেয় না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম সমাজকে একটি ঐক্যবদ্ধ ও সহযোগিতামূলক অট্টালিকার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে প্রতিটি ইট একে অপরকে শক্তিশালী করে তোলে। এই অট্টালিকার প্রতিটি অংশ যেমন অন্য অংশের ভার বহন করে, তেমনি একটি আদর্শ ইসলামী সমবায় ব্যবস্থায় একজন সদস্য অন্য সদস্যের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সমবায়ের ধারণার সঙ্গে ‘শিরকত’ বা অংশীদারি, ‘মুশারাকা’ এবং ‘মুদারাবা’র মতো ইসলামি অর্থনৈতিক চুক্তিসমূহের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানের সুদভিত্তিক শোষণের বিপরীতে ইসলাম এমন এক অর্থনীতির পথ নির্দেশ করে, যেখানে পুঁজি ও শ্রমের একটি সুষ্ঠু সমন্বয় ঘটে। মুশারাকা বা অংশীদারির মাধ্যমে একাধিক ব্যক্তি তাদের বৈধ সম্পদ একত্র করে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন এবং লব্ধ লাভ ও ঝুঁকি নিজেদের মধ্যে ন্যায়সংগতভাবে বণ্টন করে নিতে পারেন। এটি কেবল ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমে আসে এবং সম্পদের গতিশীলতা নিশ্চিত হয়। মদিনায় হিজরতের পর প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করেছিলেন, তা ছিল সমবায়ের এক অনন্য ও বাস্তব রূপ। সেই ব্যবস্থায় মুহাজিররা তাদের সবটুকু শ্রম দিয়ে আনসারদের সম্পদের সাথে সমন্বয় করে যে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন করেছিলেন, তা আজও বিশ্বের জন্য এক বিস্ময়।

একটি আদর্শ ইসলামী সমবায় সমিতির রূপরেখা কেমন হবে, তা নিয়েও ইসলামের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। প্রথমত, এর মূল ভিত্তি হতে হবে কল্যাণ চিন্তা। শুধুমাত্র ব্যবসায়িক মুনাফা নয়, বরং সামগ্রিক সমাজের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির উন্নয়নই হবে এর আসল লক্ষ্য। দ্বিতীয়ত, এর অর্থের উৎস ও বিনিয়োগ অবশ্যই পবিত্র ও হালাল হতে হবে। সুদ, ঘুষ, জুয়া কিংবা অনৈতিক কোনো ব্যবসার সঙ্গে সামান্যতম সম্পর্কও ইসলামী সমবায়কে কলুষিত করে। তৃতীয়ত, আমানতদারিতা। সমবায় পরিচালনা পর্ষদ এবং এর সাধারণ সদস্যদের মধ্যে আমানত রক্ষার মানসিকতা থাকা অপরিহার্য। ইসলাম আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। চতুর্থত, শুরা বা পরামর্শমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। স্বেচ্ছাচারিতার অবসান ঘটিয়ে সব সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সমবায়ের ঝুঁকি অনেকাংশেই হ্রাস পায়। সবশেষে, প্রতিটি লেনদেনের লিখিত হিসাব সংরক্ষণ করা। এটি ইসলামের একটি বাধ্যতামূলক নির্দেশ যা আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

বর্তমান বিশ্বে দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কৃষি উন্নয়ন এবং বেকারত্ব নিরসনে ইসলামী নীতিনিষ্ঠ সমবায় এক শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। বিশেষ করে আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির গ্রামীণ ক্ষেত্রে যেখানে মানুষ সুদের চক্রে জড়িয়ে সর্বস্বান্ত হয়, সেখানে সুদমুক্ত এই সমবায় মডেল একটি আশার আলো দেখাতে পারে। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি আত্মনির্ভরশীলতা, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং সামাজিক সংহতির এক শক্তিশালী দুর্গ। বর্তমান সময়ে বহু সমবায় উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো ইসলামের এই আদর্শ ও নৈতিক ভিত্তি বিসর্জন দেওয়া। পরিচালনা পর্ষদের দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, এবং সুদনির্ভর ঋণ প্রদানের ফলে অনেক সমবায়ই কালক্রমে সদস্যদের জন্য আশীর্বাদের চেয়ে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ইসলামী আদর্শের সমবায় ব্যবস্থা প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এখানে একজন আরেকজনের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক। এই মডেলের মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করা। বর্তমানে প্রচলিত সমবায়গুলোতে যে ধরনের প্রতারণা বা আর্থিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ শোনা যায়, তার মূলে রয়েছে আল্লাহভীতির অভাব ও নৈতিক অবক্ষয়। ইসলাম আমানতদারিতা ও স্বচ্ছতার যে শিক্ষা দেয়, তা যদি প্রতিটি সমবায় উদ্যোগে পুরোপুরি পালন করা হয়, তবে কোনো সমবায় ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই। আজ সময় এসেছে ইসলামের সেই প্রকৃত সমবায় দর্শনকে সামনে নিয়ে আসার। আমাদের নীতিনির্ধারক ও উদ্যোক্তারা যদি এই মানবিক ও কল্যাণমুখী মডেলটিকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেন, তবে দারিদ্র্যমুক্ত ও বৈষম্যহীন একটি সুখী সমাজ গঠন করা অসম্ভব হবে না। আল্লাহ আমাদের দ্বিনের সঠিক বুঝ দান করুন এবং পারস্পরিক কল্যাণের পথে চলার তৌফিক দিন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত