প্রকাশ: ৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে করা আপত্তিকর ও মানহানিকর মন্তব্যের জেরে আইনি কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে এবি পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদকে। গত ১ জুলাই ডাকসু কার্যালয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সামগ্রিক অবদান নিয়ে তার দেওয়া বক্তব্যটি নিয়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এই রেশ ধরে গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী তন্ময় কুমার সাহা এক আইনি নোটিশের মাধ্যমে ব্যারিস্টার ফুয়াদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা এবং ১০০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ৩৩তম ব্যাচের প্রাক্তন এই শিক্ষার্থী নোটিশটি পাঠিয়েছেন শিক্ষা সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বরাবরেও।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ‘বাঙালি মুসলমানের জাগরণ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক ওই আলোচনা সভায় ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ও শিক্ষকদের সম্পর্কে যে ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ ও মানহানিকর মন্তব্য করেছেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে বিগত ৫০ থেকে ৭০ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের জাতীয় অবদানের ওপর প্রশ্ন তোলা এবং তাদের জাতীয় ক্ষতির জন্য দায়ী করে দেওয়া বক্তব্যটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের বিশাল জনগোষ্ঠীকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছে। একজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে এই ধরনের বিভাজন সৃষ্টিকারী ও বিদ্বেষমূলক মন্তব্য কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামই নষ্ট করেনি, বরং সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
আইনি নোটিশে ব্যারিস্টার ফুয়াদকে আগামী ৭২ ঘণ্টার একটি সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তাকে তার দেওয়া আপত্তিকর বক্তব্য নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহার করতে হবে এবং মূলধারার ইলেকট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনসমক্ষে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক সুনাম ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার দায়ে তাকে শাস্তিমূলক ও দৃষ্টান্তমূলক ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০০ কোটি টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা তহবিলে জমা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। নোটিশ প্রদানকারী আইনজীবী আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক উন্নয়ন এবং জাতীয় সমৃদ্ধির কাজে ব্যবহৃত হতে পারবে, যা কিছুটা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সম্মানহানির ক্ষত উপশমে সহায়তা করবে।
শুধু ব্যারিস্টার ফুয়াদই নন, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকেও এই নোটিশের মাধ্যমে তলব করা হয়েছে। নোটিশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে যেন তারা ব্যারিস্টার ফুয়াদের এহেন বিদ্বেষমূলক আচরণের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও ঐতিহ্যের ওপর এই ধরনের আক্রমণকে আইনজীবী তন্ময় কুমার সাহা একটি জাতীয় ইস্যু হিসেবে দেখছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যদি নোটিশের দাবিগুলো বাস্তবায়িত না হয়, তবে জনস্বার্থে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা রক্ষায় তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদন বা পিআইএল দায়ের করবেন।
একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মুখ থেকে দেশের ঐতিহ্যের ধারক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে এই ধরনের অবমাননাকর মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনেও বড় ধরনের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে চলছে উত্তপ্ত বিতর্ক। অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা এর শিক্ষার্থীদের নিয়ে এভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা দেশপ্রেমের পরিচয় দেয় না। বিশেষ করে যেখানে দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এবং রাষ্ট্র গঠনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অবদান অবিসংবাদিত। সেখানে একজন ব্যারিস্টারের কাছ থেকে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য প্রত্যাশা করা যায় না।
আইনি নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাটি এখন আইনি মোড় নেওয়ায় এটি দেশের নাগরিক সমাজ এবং আইনজ্ঞদের নজরে রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা রক্ষা করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। এই নোটিশের মাধ্যমে তারা কেবল একটি আইনি লড়াই শুরু করেননি, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান সমুন্নত রাখার একটি দৃঢ় বার্তা দিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, নির্ধারিত ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ব্যারিস্টার ফুয়াদ তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেন কি না, নাকি বিষয়টি শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে গিয়ে গড়ায়।
এই ঘটনাটি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক নেতাদের সতর্ক হওয়ার একটি বড় শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কোনো ধরনের উস্কানিমূলক বা বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য দেওয়ার আগে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদার দিকে খেয়াল রাখা এখন সময়ের দাবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের গায়ে কালিমা লেপন করার অর্থ হলো জাতীয় ইতিহাসের একটি অংশে আঘাত করা। আশা করা হচ্ছে, আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ থাকবে। ব্যারিস্টার ফুয়াদের বিরুদ্ধে এই আইনি পদক্ষেপটি দেশের বিচার ব্যবস্থা ও নাগরিক সচেতনতার একটি বলিষ্ঠ প্রকাশ, যেখানে কেউ নিজের ইচ্ছামতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে বিদ্রূপ বা অবমাননা করার সাহস দেখাতে পারবে না।