প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বিশ্বকাপের মঞ্চে আরেকটি ঐতিহাসিক লড়াইয়ের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে উঠেছে, আর সেই সঙ্গে লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারেও যুক্ত হতে যাচ্ছে এক নতুন অধ্যায়। প্রায় দুই দশকের আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারে এবারই প্রথম ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামতে যাচ্ছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দুই ফুটবল পরাশক্তির এই লড়াই ঘিরে ইতোমধ্যেই সমর্থকদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে শেষ চারের টিকিট নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। তবে স্কোরলাইন যতটা সহজ মনে হয়, মাঠের লড়াই ছিল তার চেয়ে অনেক কঠিন। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে দুই দল ১-১ সমতায় ছিল। ম্যাচের একপর্যায়ে সুইজারল্যান্ড ১০ জনের দলে পরিণত হলেও সেই সুবিধা কাজে লাগাতে পারেনি আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধও সমতায় শেষ হয়। শেষ ১৫ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্টিনেজের গোলেই নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার জয়।
ম্যাচ শেষে স্বস্তি আর আনন্দের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায় অধিনায়ক লিওনেল মেসির কণ্ঠে। তিনি বলেন, এই জয় দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, ম্যাচটি খুবই কঠিন ছিল এবং শুরু থেকেই তাঁরা জানতেন সুইজারল্যান্ড কঠিন প্রতিপক্ষ হয়ে উঠবে। শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে খেলায় সফল হওয়ায় তিনি সতীর্থদের প্রশংসা করেন।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে মিশরের বিপক্ষে নাটকীয় জয় পাওয়ার পর আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি মেসি। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে জয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁকে দেখা যায় ভিন্ন রূপে। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে জার্সি খুলে সতীর্থদের নিয়ে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। দীর্ঘ সময় ধরে সমর্থকদের অভিবাদনও গ্রহণ করেন তিনি।
সেমিফাইনালে ওঠাকে বড় স্বস্তি হিসেবে দেখছেন মেসি। তাঁর মতে, সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। তাই এই জয় দলকে আত্মবিশ্বাসী করবে এবং পরবর্তী ম্যাচের আগে মানসিক চাপ কিছুটা কমাবে। আগামী বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত সেমিফাইনাল। সেখানে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড।
এই ম্যাচটি শুধু বিশ্বকাপের গুরুত্বের কারণেই নয়, মেসির ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের জন্যও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, ২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক অভিষেকের পর থেকে অফিসিয়াল কিংবা প্রীতি ম্যাচ—কোনো প্রতিযোগিতাতেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেননি তিনি। প্রায় ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে প্রথমবার ইংলিশদের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই তারকা। ফলে ম্যাচটি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে অবশ্য আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের দ্বৈরথ বহুবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে দুই দল। প্রথম সাক্ষাৎ ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে। সেই ম্যাচে জয় পেয়েছিল ইংল্যান্ড। এরপর ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপেও ইংলিশরা আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতেছিল।
দুই দলের সবচেয়ে আলোচিত লড়াই অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে। মেক্সিকো বিশ্বকাপের সেই কোয়ার্টার ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনা প্রথমে বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল করেন। এরপর করেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল, যা আজও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে পরিচিত। সেই ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়ে সেমিফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা এবং পরে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুটও জিতে নেয়।
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে আবারও মুখোমুখি হয় দুই দল। উত্তেজনাপূর্ণ সেই ম্যাচে ইংল্যান্ডের ডেভিড বেকহ্যাম লাল কার্ড দেখেন। পরে টাইব্রেকারে জয় তুলে নেয় আর্জেন্টিনা। তবে ২০০২ সালের বিশ্বকাপে সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয় ইংল্যান্ড। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে বেকহ্যামের একমাত্র পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় ইংলিশরা।
এরপর দীর্ঘ সময় দুই দল আর আন্তর্জাতিক ম্যাচে মুখোমুখি হয়নি। ২০০৫ সালের পর অফিসিয়াল কিংবা প্রীতি—কোনো ম্যাচেই আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের দেখা হয়নি। ফলে প্রায় দুই দশক পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে দুই পরাশক্তির মুখোমুখি হওয়া ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ম্যাচে কৌশল, অভিজ্ঞতা এবং মানসিক দৃঢ়তা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে। একদিকে রয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং নেতৃত্বে লিওনেল মেসি। অন্যদিকে তরুণ ও প্রতিভাবান ফুটবলারদের নিয়ে গড়া ইংল্যান্ড, যারা বহু বছর পর বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছে। দুই দলের আক্রমণভাগ যেমন শক্তিশালী, তেমনি রক্ষণভাগও যথেষ্ট সংগঠিত। ফলে ছোট একটি ভুল কিংবা অসাধারণ কোনো মুহূর্তই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
আর্জেন্টিনার জন্য এই সেমিফাইনাল শুধু ফাইনালে ওঠার লড়াই নয়, বরং মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে নতুন একটি প্রতিপক্ষের বিপক্ষে স্মরণীয় অভিষেকও। অন্যদিকে ইংল্যান্ড চাইবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জয় যোগ করতে। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় সেমিফাইনাল দেখার অপেক্ষায় এখন পুরো ফুটবল বিশ্ব।