ফ্রান্স-স্পেন মহারণ, সেমিফাইনালে ফাইনালের উত্তাপ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬
  • ৪১ বার

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল অনেক সময়ই ফাইনালের চেয়েও বেশি উত্তেজনা উপহার দেয়। এবারের আসরে সেই চিত্র আরও স্পষ্ট। বর্তমান বিশ্বকাপের রানার্সআপ ফ্রান্স এবং বর্তমান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন—টুর্নামেন্ট শুরুর আগে যে দুটি দলকে শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল, তারা এবার মুখোমুখি হচ্ছে ফাইনালের এক ধাপ আগে। আগামী মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই সেমিফাইনালকে ইতোমধ্যেই ফুটবল বিশ্লেষকরা ‘ফাইনালের আগের ফাইনাল’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।

দুই দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, তারকাবহুল স্কোয়াড, কৌশলগত বৈচিত্র্য এবং শিরোপা জয়ের ক্ষুধা—সব মিলিয়ে ম্যাচটি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা লড়াই হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর নজর এখন ডালাসের দিকে, যেখানে নির্ধারিত হবে এবারের বিশ্বকাপের প্রথম ফাইনালিস্ট।

বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় কিছুটা এগিয়ে রয়েছে ফ্রান্স। কোচ দিদিয়ের দেশমের অধীনে দলটি পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। ছয় ম্যাচের মধ্যে পাঁচটিতেই তারা একাধিক গোলের ব্যবধানে জয় পেয়েছে। আক্রমণভাগের গতি, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণভাগের দৃঢ়তা—সব মিলিয়ে ফরাসিরা নিজেদের প্রায় নিখুঁত একটি দলে পরিণত করেছে।

কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে ফ্রান্স। ম্যাচটিতে কিলিয়ান এমবাপ্পে শুরুতে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হলেও পরে নিজেই গোল করেন এবং মাত্র ছয় মিনিটের ব্যবধানে ওসমান দেম্বেলের গোলেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। একটি ভুল কীভাবে মুহূর্তেই অসাধারণ পারফরম্যান্সে ঢেকে দেওয়া যায়, তারই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন এই ফরাসি অধিনায়ক।

এমবাপ্পের সামনে এবার ব্যক্তিগত ইতিহাস গড়ারও সুযোগ রয়েছে। বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা এখন ২০। আর মাত্র একটি গোল করলেই বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির ২১ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করবেন তিনি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবারের আসরের প্রতিটি নকআউট ম্যাচেই গোল করেছেন এমবাপ্পে। ফলে স্পেনের বিপক্ষেও তাঁর দিকে বাড়তি নজর থাকবে ফুটবলপ্রেমীদের।

ফরাসি আক্রমণভাগে এমবাপ্পের পাশাপাশি দেম্বেলে এবং প্লেমেকার মাইকেল ওলিসে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন। টুর্নামেন্টে ইতোমধ্যেই পাঁচটি অ্যাসিস্ট করে ওলিসে নিজেকে অন্যতম সেরা সৃজনশীল ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মাঝমাঠ থেকে তাঁর নিখুঁত পাস এবং দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকই ফ্রান্সের অন্যতম বড় শক্তি।

অন্যদিকে স্পেনের সেমিফাইনালে ওঠার পথ ছিল তুলনামূলক কঠিন। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ৬৮ শতাংশ বলের দখল নিজেদের কাছে রেখেও জয় নিশ্চিত করতে তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ম্যাচের ৮৮ মিনিট পর্যন্ত। পুরো ম্যাচে আধিপত্য বজায় রাখলেও সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে কিছুটা ভুগেছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।

প্রথমার্ধে চার্লস ডি কেটেলারের গোলে পিছিয়ে পড়ার মাধ্যমে স্পেনের টানা ৬৫০ মিনিট ক্লিনশিটের রেকর্ডও ভেঙে যায়। তবে শেষদিকে মিকেল মেরিনোর গুরুত্বপূর্ণ গোলে জয় নিশ্চিত করে লা রোজারা। সেই জয়ে টুর্নামেন্টে নিজেদের অপরাজিত যাত্রাও ধরে রেখেছে তারা।

স্পেন এখন টানা ৩৬ আন্তর্জাতিক ম্যাচে অপরাজিত। আর একটি ম্যাচ হার এড়াতে পারলেই ইতালির ৩৭ ম্যাচের দীর্ঘ অপরাজিত থাকার বিশ্বরেকর্ড স্পর্শ করবে দলটি। তবে আক্রমণভাগের কার্যকারিতা নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন থেকেই গেছে। বলের দখল ধরে রাখতে পারলেও অনেক সময় প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে প্রয়োজনীয় ধার দেখা যাচ্ছে না।

স্পেনের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় তরুণ বিস্ময় লামিন ইয়ামাল। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই তিনি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক হ্যামস্ট্রিং চোটের প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। বেলজিয়ামের বিপক্ষে কয়েকটি ঝলক দেখালেও ইউরো ২০২৪-এ দেখা সেই বিধ্বংসী ইয়ামালকে পাওয়া যায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, স্পেন যদি ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে উঠতে চায়, তাহলে ইয়ামালকে শতভাগ ফিট অবস্থায় খেলতে হবে। তাঁর গতি, ড্রিবলিং এবং সৃজনশীলতা স্পেনের আক্রমণের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। একই সঙ্গে ফ্যাবিয়ান রুইস, নিকো উইলিয়ামস এবং মেরিনোকেও নিজেদের সেরাটা দিতে হবে।

কৌশলগত দিক থেকেও ম্যাচটি হতে যাচ্ছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। স্পেন বরাবরের মতো বলের দখল ধরে রেখে ধৈর্যের সঙ্গে আক্রমণ সাজাতে চাইবে। অন্যদিকে ফ্রান্স অপেক্ষা করবে প্রতিপক্ষের ছোট একটি ভুলের জন্য। বল হারানোর মুহূর্তেই এমবাপ্পে, দেম্বেলে কিংবা ওলিসের গতিময় কাউন্টার অ্যাটাক স্পেনের রক্ষণভাগের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

ম্যাচটির আরেকটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে ফরাসিদের জন্য। ১৪ জুলাই ফ্রান্সের জাতীয় দিবস বাস্তিল দিবস। সেই দিনকে সামনে রেখে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার বাড়তি প্রেরণা নিয়ে মাঠে নামবে দেশমের শিষ্যরা। অন্যদিকে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন চাইবে বিশ্বকাপের মঞ্চেও নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে।

দুই দলের সাম্প্রতিক ইতিহাস, বর্তমান ফর্ম এবং তারকাদের পারফরম্যান্স বিবেচনায় স্পষ্ট কোনো ফেবারিট নির্ধারণ করা কঠিন। তবে ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশা, ডালাসের এই মহারণ বিশ্বকাপ ইতিহাসে স্মরণীয় একটি ম্যাচ হয়ে থাকবে। কোটি দর্শকের চোখ থাকবে এমবাপ্পের গতি, ইয়ামালের জাদু এবং দুই পরাশক্তির কৌশলগত লড়াইয়ের দিকে। শেষ পর্যন্ত ফাইনালের টিকিট কার হাতে উঠবে, সেই উত্তর মিলবে ডালাসের সবুজ ঘাসেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com