শেষের ঝড়ে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা, সামনে ইংল্যান্ড

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৯ বার

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব মানেই স্নায়ুচাপ, অনিশ্চয়তা এবং শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা। কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সেই সব উপাদানই যেন একসঙ্গে উপহার দিল আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ড। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ১-১ সমতায় শেষ হওয়া ম্যাচটি গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে সুইস রক্ষণভাগ আর্জেন্টিনার একের পর এক আক্রমণ প্রতিহত করলেও শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে। অতিরিক্ত সময়ের শেষ ভাগে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল করে ৩-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এই জয়ের মধ্য দিয়ে টানা আরেকটি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে লিওনেল স্কালোনির দল। শেষ চারে তাদের প্রতিপক্ষ হবে ইংল্যান্ড।

স্কোরলাইন যতটা স্বস্তিদায়ক, ম্যাচের বাস্তবতা ছিল তার চেয়ে অনেক কঠিন। সুইজারল্যান্ড শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং উচ্চমানের লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দেয়। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে আক্রমণের পর আক্রমণ চালালেও গোলের সুযোগ কাজে লাগাতে বারবার ব্যর্থ হয়। ফলে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।

ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে থাকে। মিডফিল্ডে এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং রদ্রিগো ডি পলের সমন্বয়ে বলের দখল ধরে রাখে তারা। সেই চাপের ফল আসে মাত্র ১০ মিনিটেই। দারুণ এক আক্রমণের পর অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে পাঠিয়ে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে সুইজারল্যান্ড। প্রথমার্ধে তারা কয়েকটি দ্রুত পাল্টা আক্রমণ গড়লেও আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ সেগুলো সামাল দিতে সক্ষম হয়।

প্রথমার্ধে এগিয়ে থাকলেও দ্বিতীয় গোলের জন্য আর্জেন্টিনাকে অপেক্ষা করতে হয়। একাধিক সুযোগ তৈরি হলেও সুইস গোলরক্ষক এবং ডিফেন্ডারদের দৃঢ়তায় ব্যবধান বাড়াতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা। ফলে ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের ফিরে আসার সম্ভাবনা টিকে থাকে।

দ্বিতীয়ার্ধে দৃশ্যপট বদলে যায়। আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে সুইজারল্যান্ড। তাদের প্রচেষ্টার ফল আসে ৬৭তম মিনিটে। ড্যান এনদোয়ে দুর্দান্ত এক আক্রমণ শেষ করে সমতাসূচক গোল করেন। গোল হজমের পর আর্জেন্টিনা কিছুটা চাপে পড়ে যায়। ম্যাচের গতি তখন পুরোপুরি বদলে যায় এবং দুই দলই জয়সূচক গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।

তবে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ৭২তম মিনিটে। সুইজারল্যান্ডের ফরোয়ার্ড ব্রিল এম্বোলো দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে দশজনের দলে পরিণত হয় ইউরোপের দলটি। একজন কম নিয়ে খেললেও অসাধারণ আত্মত্যাগী ফুটবল উপহার দেয় সুইসরা। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত তারা আর্জেন্টিনার সব আক্রমণ প্রতিহত করে ম্যাচকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

অতিরিক্ত সময়েও সহজে ভাঙেনি সুইস প্রতিরোধ। আর্জেন্টিনা একের পর এক আক্রমণ চালায়। লিওনেল মেসি মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ সাজান। ডান ও বাম দুই প্রান্ত ব্যবহার করে সুযোগ তৈরির চেষ্টা চলে। সুইজারল্যান্ডের গোলরক্ষক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে এসে চাপ আর সামলাতে পারেনি তারা।

১১২তম মিনিটে বদলি খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে গড়া এক দ্রুত আক্রমণ থেকে হুলিয়ান আলভারেজ দুর্দান্ত শটে গোল করে আর্জেন্টিনাকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। সেই গোল যেন সুইজারল্যান্ডের দীর্ঘ প্রতিরোধের শেষ দেয়াল ভেঙে দেয়। ম্যাচের যোগ করা সময়ে আবারও আঘাত হানে আর্জেন্টিনা। লাউতারো মার্টিনেজ গোল করে ব্যবধান ৩-১ করেন এবং সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেন।

ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো। অধিনায়ক লিওনেল মেসি সতীর্থদের সঙ্গে উদযাপনে মেতে ওঠেন। পুরো ম্যাচজুড়ে সুইজারল্যান্ডের কঠিন প্রতিরোধের কারণে জয়টি সহজ ছিল না। তাই শেষ মুহূর্তে নিশ্চিত হওয়া এই সাফল্যের আবেগও ছিল ভিন্ন মাত্রার।

সুইজারল্যান্ড বিদায় নিলেও তাদের পারফরম্যান্স প্রশংসিত হয়েছে ফুটবল বিশ্লেষকদের কাছে। বিশেষ করে একজন খেলোয়াড় কম নিয়ে প্রায় চল্লিশ মিনিটের বেশি সময় ধরে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রুখে দেওয়া তাদের মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ বহন করে। গোলরক্ষক ও রক্ষণভাগের কয়েকজন ফুটবলার অসাধারণ লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনা আবারও প্রমাণ করেছে, বড় ম্যাচে ধৈর্য ধরে খেলার ক্ষমতা তাদের অন্যতম বড় শক্তি। পুরো ম্যাচে তারা আক্রমণের ধার বজায় রেখেছে। গোল পেতে দেরি হলেও আত্মবিশ্বাস হারায়নি। শেষ পর্যন্ত সেই ধারাবাহিক আক্রমণই জয় এনে দিয়েছে।

এই জয়ের ফলে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের পূর্ণ লাইনআপ নিশ্চিত হয়েছে। আগামী ১৪ জুলাই প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে ইউরোপের দুই শক্তিশালী দল ফ্রান্স ও স্পেন। পরদিন ১৫ জুলাই দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ইতিহাস, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় এই ম্যাচকে ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের লড়াই সব সময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। অতীতের স্মরণীয় ম্যাচ, ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দুই দলের তারকাসমৃদ্ধ স্কোয়াড নতুন এই সেমিফাইনালকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলেছে। আর্জেন্টিনা চাইবে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে জায়গা করে নিতে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডও বহু বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শিরোপার আরও কাছে পৌঁছাতে মরিয়া।

সেমিফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার জন্য স্বস্তির বিষয় হলো, কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে উঠে আসায় দলের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে। তবে ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সুযোগ নষ্ট করার সুযোগ খুব কমই থাকবে। ফলে স্কালোনির দলকে আরও কার্যকর ফুটবল খেলতে হবে।

বিশ্বকাপের শেষ চার এখন সম্পূর্ণ। এক পাশে ফ্রান্স ও স্পেন, অন্য পাশে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। চার পরাশক্তির এই লড়াইয়ের মধ্য থেকেই নির্ধারিত হবে ২০২৬ বিশ্বকাপের দুই ফাইনালিস্ট। ফুটবলপ্রেমীদের অপেক্ষা এখন সেমিফাইনালের মহারণের দিকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com