প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক নৌ-ডাকাতির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-অষ্টগ্রাম-মিঠামইন) আসনের সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। তিনি হাওরে সক্রিয় ডাকাত চক্রের উদ্দেশে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, অপরাধ বন্ধ না করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সন্ধ্যার পর হাওরে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করে তা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
শনিবার (১১ জুলাই) প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় এমপি ফজলুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইটনা, অষ্টগ্রাম ও মিঠামইন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত একাধিক নৌ-ডাকাতির ঘটনা তাঁকে উদ্বিগ্ন ও মর্মাহত করেছে। তিনি মনে করেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে চলবে না, বরং স্থানীয় জনগণকেও সচেতন ও সংগঠিত হয়ে অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, হাওর এখন শুধু স্থানীয় মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যেও পরিণত হয়েছে। তাই এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াত অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, অপরাধীদের কারণে পুরো এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়া উচিত নয়।
ভিডিও বার্তায় প্রশাসনের সাম্প্রতিক নির্দেশনারও সমালোচনা করেন তিনি। কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ সম্প্রতি প্রতিদিন বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটের পর হাওরাঞ্চলে নৌযান চলাচল ও অবস্থান থেকে বিরত থাকার জন্য সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে এমপি ফজলুর রহমান বলেন, সমস্যার সমাধান হিসেবে মানুষের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া কোনো কার্যকর উপায় হতে পারে না।
তিনি মন্তব্য করেন, “মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলার মতো সিদ্ধান্ত এটি।” তাঁর ভাষায়, হাওরাঞ্চলে যুগের পর যুগ মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে গভীর রাত পর্যন্ত নৌপথে চলাচল করেছে। তাই মানুষের চলাচল সীমিত না করে অপরাধীদের দমনেই প্রশাসনের মনোযোগ দেওয়া উচিত।
ডাকাতদের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয়ভাবে কারা এসব অপরাধে জড়িত, সে বিষয়ে তথ্য রয়েছে। তিনি দাবি করেন, অপরাধীদের পরিচয় প্রশাসনের কাছে রয়েছে এবং তারা যদি দ্রুত ডাকাতি ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে না আসে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “যারা ডাকাতি করছে, তাদের তালিকা আমাদের কাছে আছে। তোমরা যদি ডাকাতি থেকে বিরত না হও, তাহলে হাওর অঞ্চলে তোমাদের কোনো জায়গা হবে না। তোমাদের স্থান হবে জেলখানায়। এটা আমার শেষ ওয়ার্নিং।”
সংসদ অধিবেশন শেষ হওয়ার পর নিজ এলাকায় গিয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অপরাধ প্রতিরোধে মাঠে নামারও ঘোষণা দেন এমপি ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণকে সংগঠিত করে অপরাধীদের আস্তানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। তবে যারা অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান, তাদের জন্য আত্মসমর্পণের সুযোগ রাখার কথাও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, কেউ যদি আন্তরিকভাবে অপরাধ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান, তাহলে প্রশাসনের মাধ্যমে আইনগত প্রক্রিয়ায় আত্মসমর্পণ করলে বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে। তবে অপরাধ চালিয়ে গেলে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন।
ভিডিও বার্তায় তিনি আরও দাবি করেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে দেশবিরোধী কোনো গোষ্ঠীও এসব অপরাধের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। যদিও এ দাবির পক্ষে তিনি নির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। তিনি স্থানীয় জনগণকে গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
হাওরাঞ্চলের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে তিনটি থানার জন্য তিনটি দ্রুতগতির স্পিডবোট বরাদ্দের দাবি জানান তিনি। তাঁর মতে, বর্তমানে ডাকাতরা শক্তিশালী ইঞ্জিনচালিত দ্রুতগতির নৌযান ব্যবহার করছে। ফলে পুলিশের পক্ষেও তাদের ধাওয়া করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ইটনা, অষ্টগ্রাম ও মিঠামইন থানার পুলিশকে প্রয়োজনীয় নৌযান ও আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা জরুরি।
তিনি পর্যটকদের উদ্দেশেও আশ্বস্ত করে বলেন, হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে তারা যেন নির্ভয়ে আসেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং স্থানীয় জনগণ একযোগে কাজ করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এর আগে শনিবার বিকেলে কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে জানায়, পর্যটক ও সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিদিন বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটের পর হাওরাঞ্চলে যাতায়াত, অবস্থান এবং নৌযান চলাচল থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করা হয়েছে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ডাকাতির ঘটনাগুলো বিবেচনায় নিয়েই এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত কয়েক সপ্তাহে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে একের পর এক নৌ-ডাকাতির ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে। গত ৭ জুন রাতে মিঠামইন ও করিমগঞ্জ সীমান্তবর্তী হাসানপুর ব্রিজ এলাকায় প্রায় ৪০ জন পর্যটককে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে মূল্যবান মালামাল লুট করা হয়। পরে ৭ জুলাই রাতে ১৫ দিনের এক শিশুর মরদেহ বহনকারী একটি ট্রলারেও ডাকাতির ঘটনা ঘটে, যা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সর্বশেষ ৮ জুলাই রাতে ইটনা উপজেলার বগাডুবি খাল এলাকায় যাত্রীবাহী একটি ট্রলার থেকে নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন এবং বিভিন্ন মালামাল লুটের ঘটনা ঘটে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় হাওরবাসী ও পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।