দল পুনর্গঠনে বিএনপি, কাউন্সিল ও স্থানীয় নির্বাচন প্রস্তুতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ১৭ বার
দল পুনর্গঠনে বিএনপি, কাউন্সিল ও স্থানীয় নির্বাচন প্রস্তুতি

প্রকাশ:  ১৪ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি দীর্ঘ সময় পর সাংগঠনিক পুনর্গঠনের বড় উদ্যোগ নিয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মনে করছে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে এখনই দলকে নতুনভাবে সাজানোর বিকল্প নেই। সে লক্ষ্যেই জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোর পুনর্গঠন এবং তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

দলীয় একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে বিএনপির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা সরকারে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে কিছুটা শৈথিল্য তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় সংগঠনকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। দলটির শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকগুলোতেও এ বিষয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে এবং দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার বিধান থাকলেও সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। এরপর দীর্ঘ এক দশক ধরে নতুন কাউন্সিল হয়নি। যদিও এ সময় নির্বাহী কমিটিতে কয়েক দফা পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং নতুন কয়েকজন নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তবুও পূর্ণাঙ্গ কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া আর সম্পন্ন হয়নি।

দলীয় নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ দিকেই সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের বিষয়ে প্রস্তুতি চলছে। কাউন্সিলের আগে দেশের ৮২টি সাংগঠনিক জেলা ও মহানগরের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠন করার কাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্ট নেতাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কাউন্সিলে দলীয় গঠনতন্ত্রের কয়েকটি ধারা ও উপধারায় সংশোধনের বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। দীর্ঘ সময় আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়নের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর অবস্থাও একই রকম। বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ১০টির কমিটির মেয়াদ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, কৃষক দল, তাঁতীদল, মৎস্যজীবী দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, জাসাস, ওলামা দল, ছাত্রদল ও শ্রমিক দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের বিষয়েও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সক্রিয় হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নেতাদের মতে, শক্তিশালী মূল দলের পাশাপাশি অঙ্গসংগঠনগুলোকে কার্যকর না করলে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখা কঠিন হবে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির ৮২টি জেলা ও মহানগর কমিটির মধ্যে ৭২টিরই মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে ৪৯টি আহ্বায়ক কমিটি এবং ৩১টি পূর্ণাঙ্গ কমিটি থাকলেও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী মাত্র আটটি কমিটির মেয়াদ কার্যকর রয়েছে। বাকি অধিকাংশ কমিটির মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়েছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন না হলে কেন্দ্রীয়ভাবে আহ্বায়ক কমিটি গঠন এবং প্রয়োজন হলে কেন্দ্র থেকেই নতুন কমিটি দেওয়ার বিধান রয়েছে।

বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় নির্বাচনকে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছেন তারা। এজন্য এখন থেকেই সাংগঠনিক প্রস্তুতি গ্রহণ, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সক্রিয় করা এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে জরিপ পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দলীয় সূত্র জানায়, নির্দলীয় নির্বাচন হলেও জনপ্রিয়, গ্রহণযোগ্য এবং সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ব্যক্তিদের প্রার্থী হিসেবে বিবেচনায় রাখতে চায় বিএনপি।

সম্প্রতি দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে নির্বাচন কবে হতে পারে, সে বিষয়ে সম্ভাব্য সময় এবং সাংগঠনিক প্রস্তুতির রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতারা মনে করছেন, শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ছাড়া স্থানীয় নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল অর্জন কঠিন হতে পারে। তাই কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দলীয় কমিটি পুনর্গঠন একটি চলমান সাংগঠনিক প্রক্রিয়া। তবে জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন হলে সংগঠন নতুন গতি পায়। দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে থাকা ত্যাগী, সংগ্রামী ও পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং দলও আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অতীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিরোধী দলের ওপর নানা ধরনের চাপের কারণে বিএনপি স্বাভাবিক সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি। সে কারণে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনও সম্ভব হয়নি। বর্তমানে রাজনৈতিক পরিবেশ পরিবর্তিত হওয়ায় দলীয় কাউন্সিল আয়োজনের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং সে লক্ষ্যে প্রস্তুতি চলছে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও জানিয়েছেন, দলের জাতীয় কাউন্সিল চলতি বছরের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে। যদিও এখনো নির্দিষ্ট তারিখ চূড়ান্ত হয়নি, তবে প্রস্তুতির কাজ এগিয়ে চলছে। তিনি বলেন, সরকারে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দলের অনেক নেতা সাংগঠনিক কাজ থেকে দূরে রয়েছেন। ফলে সেই শূন্যতা পূরণে কিছুটা সময় লাগবে। তবে সরকার ও দল—উভয়ের কার্যক্রম নিজ নিজ গতিতে পরিচালিত হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় পর জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠন বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন, তৃণমূলে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার এবং স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি—এই তিনটি বিষয় দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের সমন্বয়, কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে আরও শক্ত অবস্থানে যেতে পারবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত