প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় জেলে, মৌয়াল ও বনজীবীদের মধ্যে আতঙ্কের নাম হয়ে থাকা কুখ্যাত ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখসহ ২৭ জন বনদস্যু অবশেষে অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিয়ে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছেন। এই আত্মসমর্পণকে সুন্দরবনে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, সরকারের ধারাবাহিক অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং কঠোর আইন প্রয়োগের ফলেই একের পর এক দস্যু বাহিনী অস্ত্র ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
কোস্ট গার্ড সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকেল পাঁচটার দিকে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার সুন্দরবনের চরপুটিয়া খালসংলগ্ন এলাকায় ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখসহ ২৭ জন সক্রিয় সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। মঙ্গলবার সকালে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, সুন্দরবনে দস্যুতার অবসান ঘটিয়ে বনজীবীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের নির্দেশনায় বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং সেই অভিযানের ধারাবাহিক ফল হিসেবেই এই আত্মসমর্পণ সম্ভব হয়েছে।
কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমানে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এসব অভিযানে কোস্ট গার্ডের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রমও রয়েছে। অভিযানের মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে ৪৫ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে দস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা ৪২ জন জেলে ও বনজীবীকে জীবিত উদ্ধার করে চিকিৎসা শেষে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আত্মসমর্পণের সময় ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যরা কোস্ট গার্ডের কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দেন। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি বিদেশি বন্দুক, একটি এইট শুটার, একটি ফোর শুটার, পাঁচটি দেশীয় একনলা বন্দুক, ১৫টি দেশীয় পাইপগান, দুটি চায়না পাইপগান, ৩৪০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ এবং ৫৫ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ। কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তারা জানান, এসব অস্ত্র দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনে ডাকাতি, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং বনজীবীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের মতো অপরাধে ব্যবহার করা হতো।
আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের মধ্যে বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখ ছাড়াও খুলনার দাকোপ, কয়রা ও বটিয়াঘাটা উপজেলার একাধিক সদস্য রয়েছেন। পাশাপাশি বাগেরহাট জেলার রামপাল, ফকিরহাট, কচুয়া, মোড়েলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলার কয়েকজন সদস্য এবং পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার একজন সদস্যও আত্মসমর্পণ করেছেন। কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় থেকে জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে টানা অভিযান এবং গোয়েন্দা নজরদারির কারণে সুন্দরবনে সক্রিয় দস্যু চক্রগুলোর কার্যক্রম অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। নিরাপদ আশ্রয়, অস্ত্র সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হয়ে পড়ায় অনেক দস্যু সদস্য আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিচ্ছেন। এর আগে ছোট সুমন বাহিনীর সাত সদস্য এবং বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর তিন সদস্যও অস্ত্রসহ কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। সর্বশেষ ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর ২৭ সদস্যের আত্মসমর্পণ সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, আত্মসমর্পণকারী বনদস্যুদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। একই সঙ্গে সরকারের নীতিমালা অনুসারে তাদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। যারা অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে আগ্রহী, তাদের জন্য পুনর্বাসনের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে যারা এখনো সুন্দরবনে দস্যুতা, অপহরণ বা অন্যান্য অপরাধে জড়িত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আওতায় কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যই নয়, বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হাজারো জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালির জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। দীর্ঘদিন ধরে বনদস্যুদের তৎপরতায় এসব মানুষকে চরম অনিরাপত্তার মধ্যে কাজ করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অপহরণ, মুক্তিপণ, হামলা ও হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে বনদস্যুদের আত্মসমর্পণ বনজীবীদের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে।
কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তারা জানান, সুন্দরবনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে শুধু অভিযান নয়, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং তথ্য আদান-প্রদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বনজীবীদের সঙ্গে সমন্বয়, নিয়মিত টহল, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। এর ফলে দস্যুদের চলাচল সীমিত হয়ে এসেছে এবং তারা ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে কোস্ট গার্ড আরও জানায়, সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত ঘোষণা করার লক্ষ্য নিয়ে তাদের অভিযান চলমান থাকবে। নিয়মিত টহল, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত অভিযান এবং বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতেও কঠোর অবস্থানে থাকবে বাহিনীটি। একই সঙ্গে এখনো সক্রিয় থাকা অন্যান্য বনদস্যুদের অস্ত্র ত্যাগ করে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে আগ্রহী, তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হবে। তবে যারা অপরাধের পথ অব্যাহত রাখবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে কোস্ট গার্ড।