প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
লালমনিরহাটসহ তিস্তা অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় আবারও বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। যদিও মঙ্গলবার সকালে পানির প্রবাহ কিছুটা কমেছে, তবুও পানি এখনো বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপরে থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না। নদীপারের অনেক এলাকায় ইতোমধ্যে পানি ঢুকে পড়েছে, তলিয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি, আর যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক জায়গায় নৌকা ও ভেলার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার রাতজুড়ে তিস্তার পানি পর্যায়ক্রমে বিপৎসীমার ৩, ১০ এবং সর্বোচ্চ ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এরপর মঙ্গলবার সকালে পানি কিছুটা কমে বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপরে নেমে আসে। তবে পানি এখনও বিপৎসীমার নিচে না নামায় নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার ঝুঁকি রয়ে গেছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গত মাসের শেষ দিকেও তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে স্বল্পমেয়াদি বন্যার সৃষ্টি করেছিল। সে সময় মাত্র এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও চলতি সপ্তাহে আবারও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে নদীর পানি ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে এবং সোমবার সন্ধ্যার পর তা বিপৎসীমা অতিক্রম করে। ফলে চলতি বর্ষা মৌসুমে দ্বিতীয়বারের মতো বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লালমনিরহাট জেলার তিস্তা তীরবর্তী বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের অনেক রাস্তাঘাট পানির নিচে চলে যাওয়ায় স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় মানুষ এখন নৌকা কিংবা অস্থায়ী ভেলার মাধ্যমে চলাচল করছেন। কৃষিজমিতে পানি ওঠায় আমন ধানের চারা, সবজি এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়ছে। কৃষকদের পাশাপাশি গবাদিপশু নিয়েও উদ্বেগে রয়েছেন চরবাসীরা।
পাটিকাপাড়া ইউনিয়নের চরাঞ্চলের বাসিন্দা কামরুজ্জামান বলেন, কয়েকটি বাড়িতে ইতোমধ্যেই পানি ঢুকে পড়েছে। নদীর পানির স্রোত ও চাপ দেখে স্থানীয়দের মধ্যে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা আশা করছেন, পানি দ্রুত কমে গেলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্ষা মৌসুমে তিস্তার পানির এমন আকস্মিক বৃদ্ধি এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উজানে ভারি বৃষ্টিপাত হলেই খুব অল্প সময়ের মধ্যে নদীর পানি বৃদ্ধি পায়, যার ফলে চরাঞ্চলের মানুষ আগাম প্রস্তুতির পর্যাপ্ত সময় পান না। এতে জীবন ও জীবিকা দুটিই ঝুঁকির মুখে পড়ে। অনেক সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাটবাজার এবং স্থানীয় সড়ক যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানিয়েছেন, ভারি বৃষ্টিপাত এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহ বেড়েছে। মঙ্গলবার সকাল ছয়টায় ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং পানির প্রবণতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার বলেন, মাঠ পর্যায়ে তাদের একাধিক টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে। কোথাও বাঁধে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না, পানি কীভাবে প্রবাহিত হচ্ছে এবং নিম্নাঞ্চলের পরিস্থিতি কেমন—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তিস্তা অববাহিকার মানুষ প্রায় প্রতি বর্ষা মৌসুমেই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অতিবৃষ্টি এবং উজানের ঢলের কারণে নদীর পানির আচরণ আগের তুলনায় আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যার সৃষ্টি হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এ কারণে আগাম সতর্কবার্তা, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে সদ্য রোপণ করা আমন ধানের চারা ও অন্যান্য মৌসুমি ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি চরাঞ্চলের গবাদিপশুর খাদ্যসংকটও দেখা দিতে পারে। এজন্য কৃষকদের প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, নদীতীরবর্তী এলাকার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ত্রাণ ও জরুরি সহায়তার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি সংকটজনক না হলেও পানি বিপৎসীমার নিচে না নামা পর্যন্ত উদ্বেগ কাটছে না। আবহাওয়ার পরিস্থিতি এবং উজানের পানির প্রবাহের ওপর আগামী কয়েক দিনের অবস্থা অনেকটাই নির্ভর করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নদীপাড়ের মানুষের প্রত্যাশা, তিস্তার পানি দ্রুত কমে গিয়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসবে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে তারা জানেন, বর্ষা মৌসুমে তিস্তার আচরণ যে কোনো সময় বদলে যেতে পারে। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন, যাতে সম্ভাব্য বন্যার ক্ষয়ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা যায়।