প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে দেশ। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার এই যাত্রাপথ মসৃণ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বর্তমান সরকার। এই লক্ষ্য অর্জনে এক বড় ধরণের কূটনৈতিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং গ্রুপ অব ৭৭ অ্যান্ড চায়না (জি-৭৭) এর শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির বিষয়ে জোরালো সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। এই সমর্থন কেবল বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে এক বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ইইউ প্রতিনিধিদলের প্রধান রাষ্ট্রদূত স্টাভরোস ল্যামব্রিনিডিস এবং জি-৭৭ এর চেয়ার রাষ্ট্রদূত লরা দুপুই লাসেরের পৃথক বৈঠকগুলো অত্যন্ত ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ হয়েছে। বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়ার প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বৃদ্ধির জন্য যৌক্তিক ও বলিষ্ঠ প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বব্যাপী চলমান অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন। মন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, বাংলাদেশ এই মুহূর্তে একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে যে সংস্কার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, তা টেকসই করার জন্য অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের অন্যান্য সদস্যের মধ্যে ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী এবং দেশের প্রধান রপ্তানিমুখী খাতের প্রতিনিধিরা। বাণিজ্যমন্ত্রী বৈঠকে বর্তমান সরকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধি পেলে এই সংস্কার কার্যক্রম আরও সুসংহত হবে এবং এলডিসি উত্তরণটি কেবল একটি সাংবিধানিক পরিবর্তন নয়, বরং একটি টেকসই ও অপরিবর্তনীয় অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প হয়ে উঠবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত স্টাভরোস ল্যামব্রিনিডিস সরকারের গৃহীত সংস্কার উদ্যোগের প্রশংসা করে জানান, ইইউ বাংলাদেশের এই যাত্রায় দীর্ঘমেয়াদী অংশীদার হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী। তিনি বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনার গুরুত্ব আরোপ করেন, যা বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বাজার প্রসারে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তিনি বলেন, মসৃণ এলডিসি উত্তরণের জন্য সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ অপরিহার্য এবং এ বিষয়ে ইইউ তার সব ধরণের প্রযুক্তিগত ও নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখবে। ইইউর এই প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও চামড়া শিল্পের জন্য বড় ধরণের স্বস্তি বয়ে এনেছে।
অন্যদিকে জি-৭৭ অ্যান্ড চায়নার চেয়ার রাষ্ট্রদূত লরা দুপুই লাসেরে বাংলাদেশের দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। তিনি বাংলাদেশের বাস্তবমুখী ও সাহসী সংস্কার কর্মসূচিকে অত্যন্ত গঠনমূলক হিসেবে আখ্যা দেন। জি-৭৭ এর পক্ষ থেকে তিনি প্রস্তাব করেন যে, অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো যাতে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ কৌশলের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে, সে জন্য একটি বিশেষ ব্রিফিং আয়োজন করা হবে। এই প্রস্তাবটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সম্মানের এবং এটি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার বার্তাটি আরও জোরালোভাবে পৌঁছে দেবে। জি-৭৭ এর মতো শক্তিশালী একটি জোটের এমন সমর্থন বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বৈঠক শেষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব জানান, প্রতিনিধিদলগুলোর সঙ্গে আলোচনার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ এবং গঠনমূলক। তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন যে, বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির অনুরোধটি কেবল অনুকম্পা নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকেই গৃহীত হয়েছে। সরকার এখন যে কাঠামোগত পরিবর্তন ও আর্থিক খাতের শক্তিশালীকরণে কাজ করছে, তা বাস্তবায়নের জন্য বাড়তি সময় পাওয়া গেলে দেশ দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা ভোগ করবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই কূটনৈতিক সাফল্য বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থার জায়গাটিকে আরও মজবুত করেছে।
বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান, দেশের রপ্তানি আয় এবং জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে ইইউ ও জি-৭৭ এর মতো বৃহৎ শক্তির এমন সমর্থন বাংলাদেশকে এক বিশেষ সুবিধা প্রদান করবে। এখন সরকারের মূল লক্ষ্য হবে এই বাড়তি সময়কে কাজে লাগিয়ে দেশের শিল্পখাতকে আরও আধুনিকায়ন করা এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা। সামগ্রিকভাবে, জাতিসংঘের প্ল্যাটফর্মে অর্জিত এই কূটনৈতিক সাফল্য আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও বেগবান করার জন্য এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।