প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং পাহাড়ধসের কারণে দেশের পার্বত্য জেলা বান্দরবানের লামা উপজেলায় সৃষ্ট দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে। অনেক পরিবারের বসতঘর আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় নষ্ট হয়েছে ফসল, ব্যাহত হয়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের পক্ষ থেকে উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকার দুই হাজার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় এই মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। দুর্যোগকবলিত মানুষের খাদ্যসংকট কিছুটা হলেও লাঘব করা এবং তাদের পাশে থাকার বার্তা পৌঁছে দেওয়াই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বিকেলে লামা উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সহায়তা কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বান্দরবান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব জাবেদ রেজা। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে খাদ্যসামগ্রী তুলে দিয়ে বলেন, দুর্যোগের সময় রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কষ্ট লাঘবে বিএনপি ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভবিষ্যতেও এ ধরনের সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বান্দরবান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক জসিম উদ্দিন তুষার, রিটন বিশ্বাস ও আলমগীর চৌধুরী। এছাড়া সদস্য সেলিম রেজা, শাহাদাত হোসেন, গোলাম সরওয়ার, লামা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুর রব, সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম খান, পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মো. সাইফুদ্দিন, বিএনপি নেতা আরিফ চৌধুরী, মোহাম্মদ ইব্রাহিম, মো. শাহীনসহ স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারের জন্য চাল, ডাল, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আগত মানুষ নির্ধারিত স্থানে এসে এই সহায়তা গ্রহণ করেন।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনের টানা বর্ষণে বান্দরবানের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একই সঙ্গে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে লামা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। এতে বহু পরিবার সাময়িকভাবে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। অনেক কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষের কর্মসংস্থানও ব্যাহত হয়। ফলে খাদ্যসংকট ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় পড়েন বহু মানুষ।
ত্রাণ গ্রহণকারী কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা জানান, পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে কয়েক দিন ধরে তারা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারেননি। অনেকের ঘরে রান্নার মতো খাদ্যসামগ্রীও ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে পাওয়া এই সহায়তা তাদের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি এনে দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত আলী আকবর বলেন, বৃষ্টির কারণে কাজ বন্ধ থাকায় পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। এই খাদ্যসামগ্রী অন্তত কয়েক দিনের জন্য তাদের দুশ্চিন্তা কমাবে।
একই ধরনের অনুভূতি প্রকাশ করেন বানু বেগম। তিনি বলেন, পাহাড়ধসের আশঙ্কায় পরিবার নিয়ে নিরাপদ স্থানে যেতে হয়েছিল। ঘরের অনেক জিনিসপত্র নষ্ট হয়েছে। এই সময়ে খাদ্য সহায়তা পাওয়া তাদের জন্য বড় ধরনের সহযোগিতা। লুনা আক্তারও জানান, দুর্যোগের কারণে এলাকার বহু পরিবার সংকটে রয়েছে। এমন উদ্যোগ আরও মানুষের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন।
লামা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুর রব বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো একটি সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব। তিনি জানান, স্থানীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন নিয়মিত মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যাদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি সংকটাপন্ন, তাদের কাছে পর্যায়ক্রমে আরও সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংগঠনও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে এগিয়ে আসবে।
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চলমান বর্ষা মৌসুমে বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ধস ও আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি এখনও পুরোপুরি কাটেনি। আবহাওয়া পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার জন্যও স্থানীয় প্রশাসন জনগণকে আহ্বান জানিয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্য এলাকায় অতিবৃষ্টি হলে পাহাড়ধস এবং আকস্মিক ঢলের ঝুঁকি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এ সময় শুধু জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম নয়, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং পুনর্বাসনের বিষয়েও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে পাহাড় কাটাসহ পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধ এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং কর্মহীন মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলে।
লামায় বিএনপির এই মানবিক সহায়তা কার্যক্রম দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে রাজনৈতিক দলগুলোর সামাজিক দায়িত্ব পালনের একটি উদাহরণ হিসেবে স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। তবে এমন সহযোগিতা তাদের সংকটময় সময়ে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট নেতারা আশ্বাস দিয়েছেন।