প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে এক নারী বন্দির পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় কারা প্রশাসনের ভেতরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে দুইজন মেট্রন ও পাঁচজন মহিলা কারারক্ষীসহ মোট সাতজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন, পলাতক বন্দিকে গ্রেপ্তার এবং কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত ও আইনগত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
কারা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে দায়িত্ব পালনে গাফিলতির বিষয়টি উঠে আসায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শনিবার (১৮ জুলাই) সকালে সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (এআইজি) মো. জান্নাতুল ফরহাদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়ায় শুক্রবার সাতজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেজন্য কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন মেট্রন লায়লা আনজুমান সুমি, মেট্রন মেরিনা ও মেট্রন রেহেনা। এছাড়া মহিলা কারারক্ষী শায়লা, শারমিন, জেমি ও আসমাকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। কারা প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনের সময় প্রয়োজনীয় তদারকি নিশ্চিত না করায় বন্দির পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
ঘটনাটি ঘটে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়। কারা সূত্রে জানা যায়, ওই সময় প্রায় ৪০ জন নারী বন্দিকে কারাগারের অভ্যন্তরে ইট বহনের কাজে নিয়োজিত করা হয়েছিল। বন্দিদের কাজ চলাকালে দায়িত্বপ্রাপ্ত মেট্রনের পর্যবেক্ষণে ঘাটতি দেখা দেয়। সেই সুযোগে ২১ বছর বয়সী বন্দি রিম্পা অফিস ভবনের পাশের দেয়ালের কার্নিশ বেয়ে কারাগারের সীমানা প্রাচীর টপকে বাইরে চলে যান। ঘটনাটি প্রথমে কেউ বুঝতে পারেননি। পরে বন্দিদের উপস্থিতি যাচাইয়ের সময় একজন কম থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে।
পলাতক রিম্পার বাড়ি মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার রায়পুর এলাকায়। তিনি মো. হাসানের মেয়ে। ঢাকার ধানমন্ডি থানা এলাকায় পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের একটি মামলায় তিন মাসের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে সাজা ভোগ করছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তার সাজা দীর্ঘমেয়াদি না হলেও আইন অনুযায়ী কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঘটনার পরপরই পুরো কারাগার এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়। প্রতিটি ওয়ার্ড, ভবন এবং কারাগারের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অংশে অনুসন্ধান করা হলেও রিম্পার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে কারাগারের বিভিন্ন স্থাপনায় স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তিনি সত্যিই দেয়াল টপকে কারাগারের বাইরে চলে গেছেন। এরপর দ্রুত আশপাশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি জানানো হয় এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে নজরদারি বাড়ানো হয়।
পরবর্তীতে শুক্রবার রাতে কারা কর্তৃপক্ষ গাজীপুরের কোনাবাড়ী মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করে। মামলার পর পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পলাতক বন্দিকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান শুরু করেছে। বিভিন্ন জেলার পুলিশ ইউনিটকেও প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কারা নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক কারাগারে বন্দিদের চলাচল, শ্রম কার্যক্রম এবং নিরাপত্তা তদারকি অত্যন্ত সমন্বিতভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা। কোনো বন্দিকে কাজে নিয়োজিত করার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হয়। বিশেষ করে সীমানা প্রাচীর, প্রশাসনিক ভবন এবং অপেক্ষাকৃত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সামান্য শৈথিল্যও বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই এ ধরনের ঘটনার পর শুধু দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই যথেষ্ট নয়, বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।
বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে অতীতেও বিচ্ছিন্নভাবে বন্দি পলায়নের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হলেও নতুন করে এমন ঘটনা সামনে আসায় কারা ব্যবস্থাপনা নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, পর্যাপ্ত জনবল, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং দায়িত্বশীল তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এমন ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান ঘটনায় শুধু বরখাস্ত করেই দায়িত্ব শেষ হচ্ছে না। তদন্তে আরও কারও গাফিলতির প্রমাণ মিললে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর নিরাপত্তা ব্যবস্থার যেসব ত্রুটি চিহ্নিত হবে, সেগুলো দ্রুত সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এদিকে পলাতক রিম্পাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে পুনরায় কারাগারে ফিরিয়ে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান অব্যাহত রেখেছে। বিভিন্ন স্থানে নজরদারি বৃদ্ধি, সম্ভাব্য আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে খোঁজখবর এবং গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, প্রযুক্তিগত তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে আটক করা সম্ভব হবে।
ঘটনাটি দেশের কারা ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা, জবাবদিহি এবং দায়িত্বশীলতার প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। কারা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সাতজনকে বরখাস্ত করা হলেও তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল এবং পলাতক বন্দিকে গ্রেপ্তারের অগ্রগতি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সংস্কার কতটা বাস্তবায়িত হয়, সেদিকেও নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহল ও সাধারণ মানুষের।