প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশকে আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, একটি আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকার ইতোমধ্যে বিস্তৃত সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা, ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন খাত সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ উৎপাদন ও বিনিয়োগকেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে কর্মসংস্থান ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বৈদেশিক বিনিয়োগ ত্বরান্বিতকরণ’ শীর্ষক এফডিআই সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং ব্যবসায়িক নেতাদের উপস্থিতিতে তিনি বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক রূপকল্প তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার বিশ্বাস করে টেকসই উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হবে বেসরকারি খাত এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ। সে কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে সরকার আইনগত সুরক্ষা, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশে বিনিয়োগকারীরা শুধু ব্যবসার সুযোগই পাবেন না, বরং সরকারের পূর্ণ সহযোগিতাও পাবেন।
তিনি বলেন, বর্তমান বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধ শিল্প, ইলেকট্রনিক্স, ডিজিটাল সেবা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, উন্নত বস্ত্রশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা এবং লজিস্টিকস খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে কর-সুবিধা, প্রণোদনা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং শিল্পায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে সরকার আশা করছে।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। আধুনিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে এই জনশক্তিই অর্থনীতির রূপান্তরে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, তাঁর সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিনিয়োগকারীদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। নির্বাচন-পূর্ব সময় থেকেই ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন সহযোগী, উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন চেম্বারের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা হয়েছে। এসব আলোচনায় বিনিয়োগকারীরা যে বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, তার মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগের আইনি সুরক্ষা, সহজ করব্যবস্থা, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি, লাভ দেশে ফেরত নেওয়ার সহজ প্রক্রিয়া, শক্তিশালী পুঁজিবাজার এবং উন্নত অবকাঠামো।
তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আধুনিকায়ন শুরু করেছে। কর ও ভ্যাট প্রশাসনকে আরও সহজ ও ডিজিটাল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক জটিলতা, অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ এবং লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সেবা আরও কার্যকর করার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তারেক রহমান আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বন্দর ও লজিস্টিকস অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। পাশাপাশি স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে নতুন নীতিমালা ও অর্থায়ন সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, এসব পদক্ষেপ বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিনিয়োগের একটি প্রতিযোগিতামূলক গন্তব্যে পরিণত করবে।
প্রধানমন্ত্রী বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বলেন, বাংলাদেশে শুধু বিনিয়োগ নয়, দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার এখনই উপযুক্ত সময়। তিনি দেশি ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, একটি নিয়মভিত্তিক, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত এবং বেসরকারি খাতনির্ভর অর্থনীতি গড়তে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
বক্তব্যে নিজের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজনীতিতে আসার আগে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকায় তিনি জানেন, শুধু উদ্যোক্তার দক্ষতা নয়, বরং সরকারের সহায়ক নীতিমালাও ব্যবসার সফলতার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
সম্মেলনে প্রায় ৬০০ দেশি-বিদেশি প্রতিনিধি অংশ নেন। অনুষ্ঠানে এফআইসিসিআই সভাপতি ও বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুপালী হক চৌধুরী স্বাগত বক্তব্য দেন। একই অনুষ্ঠানে ‘ফিকি এফডিআই রিপোর্ট ২০২৬’ প্রকাশ করা হয়, যেখানে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। উদ্বোধনী পর্বের আগে প্রধানমন্ত্রী ইনভেস্টরস এক্সপো পরিদর্শন করেন এবং বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে ধারাবাহিক বিনিয়োগ, রপ্তানি সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সরকারের ঘোষিত সংস্কার কার্যক্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।