সর্বশেষ :

চুক্তি না হলে ইরানকে ‘বড় মূল্য’ দিতে হবে: রুবিও

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
  • ১৪ বার
চুক্তি না হলে ইরানকে ‘বড় মূল্য’ দিতে হবে: রুবিও

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তেহরান যদি দ্রুত একটি নতুন সমঝোতায় না পৌঁছায়, তবে তাদের আরও বড় মূল্য দিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন, ইরান অতীতেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি মেনে চলেনি এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ইতিহাস রয়েছে। তাঁর এই মন্তব্য এমন এক সময় এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ইয়েমেন সংকটকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে মার্কো রুবিও বলেন, তাঁর মূল্যায়নে ইরান একটি নতুন চুক্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। তবে তিনি দাবি করেন, তেহরান এখনো এমন অবস্থানে নেই, যেখানে একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব। তাঁর ভাষায়, ইরান যদি বর্তমান অবস্থান থেকে সরে না আসে, তাহলে তাদের জন্য কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়বে।

রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো চুক্তিতে যেতে চায় না, যা পরে বাস্তবায়িত হবে না। তাঁর অভিযোগ, অতীতে ইরান একাধিক আন্তর্জাতিক সমঝোতায় অংশ নিলেও পরে বিভিন্ন শর্ত পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে কিংবা চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন থেকে সরে এসেছে। এ কারণে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে ভবিষ্যতের যেকোনো সমঝোতা হতে হবে কঠোর যাচাই-বাছাই এবং বাস্তবায়নের নিশ্চয়তাসহ।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সংঘাত বাড়ানো নয়; বরং এমন একটি সমঝোতা নিশ্চিত করা, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ দূর হয়। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আলোচনার সুযোগ চিরকাল খোলা থাকবে—এমন ধারণা ভুল। তাঁর মতে, সময় যত গড়াবে, ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপও তত বাড়তে থাকবে।

ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়েও কড়া অবস্থান তুলে ধরেন রুবিও। তিনি বলেন, লোহিত সাগর ও আশপাশের অঞ্চলে নিরাপত্তা সংকট নিরসনে হুতি গোষ্ঠীর উত্তেজনা কমানো জরুরি। তাঁর অভিযোগ, হুতিদের কর্মকাণ্ড আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং তারা ইরানের প্রভাবের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। যদিও ইরান দীর্ঘদিন ধরেই হুতিদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে, যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই দাবি করে আসছে যে, তেহরান বিদ্রোহী গোষ্ঠীটিকে রাজনৈতিক, সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, রুবিওর বক্তব্য শুধু ইরানকে উদ্দেশ্য করেই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশলগত অবস্থানেরও একটি ইঙ্গিত বহন করছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর এবং আরব উপদ্বীপজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ বেড়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করার নীতিও সামনে আনছে যুক্তরাষ্ট্র।

সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন মার্কো রুবিও। তিনি জানান, প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। তাঁর ভাষায়, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম কৌশলগত অংশীদার এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হবে বলে ওয়াশিংটন আশা করছে।

রুবিও বলেন, বিশ্বের যেসব দেশ শান্তিপূর্ণ বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে আগ্রহী, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারিত্বে কাজ করে। এতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান বজায় রাখা এবং প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে তাঁর মত।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই সৌদি আরবের সঙ্গে হওয়া এই পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি কংগ্রেসে জমা দিতে পারে। গত বছর রিয়াদে দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছিল। এখন সেই উদ্যোগকে পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা জোরদার করার উদ্যোগ এবং একই সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় অবস্থান নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য নীতির অংশ। একদিকে ওয়াশিংটন তার ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চাইছে, অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত রাখতে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার কৌশল অনুসরণ করছে।

অন্যদিকে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য পরিচালিত হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলোর আশঙ্কা, এই কর্মসূচির মাধ্যমে ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। এই মতপার্থক্যই দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম প্রধান বিরোধের কারণ হয়ে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, সামনের কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার পর্যবেক্ষণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর। আলোচনার পথ খোলা থাকলেও উভয় পক্ষের অবস্থান এখনো কঠোর হওয়ায় দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সহজ হবে না বলেই মনে করছেন তারা।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, সৌদি আরব এবং ইয়েমেন ইস্যুগুলো একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ফলে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং কৌশলগত জোটকে ঘিরে আগামী দিনগুলোতে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়তে পারে। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরও থাকবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নতুন কোনো আলোচনায় বসতে পারে কি না এবং উত্তেজনা প্রশমনে বাস্তবসম্মত কোনো সমাধান বেরিয়ে আসে কি না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত