চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা, এক পদে ২৮৭ আবেদনকারী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ২২ বার
চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা, এক পদে ২৮৭ আবেদনকারী

প্রকাশ:   ০৩ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

করোনাভাইরাস মহামারির বৈশ্বিক ধাক্কা এবং পরবর্তী নানা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারে এক নজিরবিহীন সংকট ও তীব্র প্রতিযোগিতার আবহ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারে বর্তমানে প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে চাকরিপ্রার্থীর প্রতিযোগিতা পূর্বের তুলনায় প্রায় ৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের খ্যাতনামা গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বা বিআইডিএসের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণায় এই ভয়াবহ চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সেমিনারে গবেষণা প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের বিশিষ্ট গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক অতনু রাব্বানী। তার উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের শ্রমবাজারে একটিমাত্র শূন্য পদের বিপরীতে গড়ে প্রায় ২৮৭ জন যোগ্য চাকরিপ্রার্থী আবেদন করছেন। অথচ কভিড মহামারি শুরুর আগের স্বাভাবিক সময়ে এই সংখ্যাটি ছিল মাত্র ১৭৩ জন। বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের এই করুণ চিত্র দেশের তরুণ সমাজ ও শিক্ষিত বেকারদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয় অর্থনীতি ও বৈশ্বিক নানা অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। এর সরাসরি ফলস্বরূপ শ্রমবাজারে চাকরিপ্রার্থীদের জন্য পারস্পরিক প্রতিযোগিতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। ফলে সাধারণ তরুণ-তরুণীদের জন্য কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের সুযোগ দিন দিন আগের তুলনায় আরও অনেক বেশি কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। এই গবেষণার মূল ভিত্তি হিসেবে ২০১৫ সালের জুন মাস থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ দশ বছরেরও বেশি সময় অর্থাৎ ৫৪৭ সপ্তাহের প্রামাণ্য তথ্য নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ এবং জনপ্রিয় একটি অনলাইন চাকরির পোর্টালে প্রকাশিত যাবতীয় তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই গবেষণাকর্মটি সফলভাবে পরিচালনা করা হয়েছে। গবেষণায় মূলত বিভিন্ন চাকরির বিজ্ঞপ্তি, মোট শূন্য পদের সংখ্যা, চাকরিপ্রার্থীদের আবেদন করার হার এবং করোনাভাইরাস মহামারি কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো রেট পরিবর্তনের মতো বড় বড় অর্থনৈতিক ঘটনার প্রভাব অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

গবেষণার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে জানানো হয়েছে যে পর্যবেক্ষণকালজুড়ে প্রতি সপ্তাহে সারা দেশে গড়ে ১ হাজার ১৫৪টি চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। এসব বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৩ হাজার ৬৪৬টি শূন্য পদ উন্মুক্ত হয়েছে বলে নথিপত্রে উঠে এসেছে। অন্যদিকে, চাকরিপ্রার্থীদের তীব্র আগ্রহ ও সংকটের কারণে এসব শূন্য পদের বিপরীতে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৬ লাখ ৯৭ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেಷণে দেখা যায় যে ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে শুরু করে জুন মাস পর্যন্ত করোনাকালে দেশব্যাপী যখন কঠোর লকডাউন কার্যকর ছিল, তখন দেশের প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজার সবচেয়ে বড় ধাক্কার মুখোমুখি হয়। ওই সংকটময় সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রায় ৭০ দশমিক ২ শতাংশ এবং মোট শূন্য পদের সংখ্যা প্রায় ৭৫ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছিল। একই সময়ে চাকরিপ্রার্থীদের আবেদন জমার সংখ্যাও কিছুটা কমে গিয়েছিল, তবে আশঙ্কার বিষয় হলো সেই হ্রাসের হার ছিল তুলনামূলকভাবে কম, যা ছিল প্রায় ৫৯ দশমিক ১ শতাংশের কাছাকাছি।

এর ফলে সামগ্রিকভাবে চাকরির সুযোগ বা শূন্য পদ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেলেও চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা সে তুলনায় অনেক বেশি থাকায় প্রতি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। সে সময় প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদনকারীর এই সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ২৮৭ দশমিক ৩ জনে, যা দেশের শ্রমবাজারের ভঙ্গুর অবস্থাকে অত্যন্ত স্পষ্ট করে তোলে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করে গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে মহামারির ভয়াবহ সেই সময়ে উন্নত বিশ্বের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে শূন্য পদের সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। এছাড়া যুক্তরাজ্যে এই হ্রাসের হার ছিল ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে। কিন্তু বৈশ্বিক অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করোনা মহামারির সময় প্রাতিষ্ঠানিক শূন্য পদ কমার হার ছিল আরও অনেক বেশি মারাত্মক। যদিও মহামারি পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে, তবুও সার্বিকভাবে শ্রমবাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এখনও আগের মতোই উচ্চমাত্রায় বহাল রয়েছে।

গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক অতনু রাব্বানী তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে শ্রমবাজারের এই বিশেষ সূচকটি মূলত দেখায় যে প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে ঠিক কতজন চাকরিপ্রার্থী একে অপরের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছেন। এই সংখ্যার পরিমাণ যত বেশি হবে, দেশের সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের জন্য শ্রমবাজার তত বেশি প্রতিকূল ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে। দেশের লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ পড়াশোনা শেষ করে যখন চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন, তখন এই বিশাল ব্যবধান তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। চাকরিপ্রত্যাশীদের এই তীব্র সংকট নিরসন করতে হলে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মকে কেবল গতানুগতিক চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হতে এবং বিভিন্ন কারিগরি ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনে উৎসাহিত করার কোনো বিকল্প নেই। নীতিনির্ধারক মহল যদি সময়োপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে আগামী দিনে বেকারত্বের এই ভয়াবহ চাপ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com