প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে যুক্ত হলে বা তাদের সংস্পর্শে গেলে মানুষের ভেতরের হিতাহিতজ্ঞান সম্পূর্ণরূপে লোপ পায় বলে অত্যন্ত কঠোর ও বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী ও বিশিষ্ট বিএনপি নেতা রাশেদ খাঁন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবীণ রাজনীতিক ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় তিনি এই মন্তব্য করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ভেরিফায়েড প্রোফাইলে প্রকাশিত একটি দীর্ঘ পোস্টে রাশেদ খাঁন কর্নেল অলি আহমেদের রাজনৈতিক ভূমিকা, অতীত কর্মকাণ্ড এবং সাম্প্রতিক ব্যক্তিগত আক্রমণ নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন, যা মুহূর্তেই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ফেসবুক পোস্টে রাশেদ খাঁন উল্লেখ করেন যে, কর্নেল অলি আহমেদের মতো প্রবীণ ও বর্ষীয়ান একজন রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং শালীনতাবহির্ভূত বক্তব্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়। তিনি অভিযোগ করেন যে, অলি আহমেদ রাজনৈতিক সমালোচনা সহ্য করতে না পেরে তার পারিবারিক পরিচয় এবং বাবা-মাকে জড়িয়ে অত্যন্ত ঘৃণ্য ও মানহানিকর মন্তব্য করেছেন, যার ফলে তিনি জনমানসে নিজের ন্যূনতম সম্মান ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছেন। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে তিনি বিষয়টি নিয়ে কথা বলছেন বলে জানান। রাশেদ খাঁন তার বক্তব্যে আরও প্রশ্ন তোলেন যে, অতীতে এক সপ্তাহের মধ্যে তৎকালীন বিএনপি সরকারের পতন ঘটানোর হুমকি দেওয়ার পেছনে গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট জনৈক মাসুদ করিমের সঙ্গে অলি আহমেদের কোনো গোপন সখ্যতা বা আর্থিক লেনদেন ছিল কি না, তা নিয়ে এর আগেও প্রথম আলোসহ দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, অলি আহমেদের যদি সৎ সাহস থাকে, তবে তিনি যেন প্রকাশ্যে অস্বীকার করেন যে মাসুদ করিমের সঙ্গে তার কোনো ধরনের সম্পর্ক বা যোগাযোগ ছিল না।
অতীতের রাজনৈতিক সমীকরণ ও আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে রাশেদ খাঁন দাবি করেন যে, তাকে বিভিন্ন সময় ‘র’ (RAW) কিংবা ‘মোসাদের’ এজেন্ট বলে ট্যাগ দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। অথচ যখন পুরো দেশজুড়ে আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জোরদার সংগ্রাম চলছে এবং তারা রাজপথে মার খাচ্ছেন ও মিথ্যা মামলার শিকার হচ্ছেন, সেই সংকটময় মুহূর্তে অলি আহমেদ নাকি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে আপস করে বিরোধী দলের দীর্ঘদিনের আন্দোলনকে নস্যাৎ করার চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছিলেন। রাশেদ খাঁনের দাবি অনুযায়ী, অতীতে জামায়াতের হাতে আসন তুলে দেওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে কর্নেল অলি বিএনপি থেকে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি আসন দাবি করেছিলেন। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে দেখা যায় যে, তুলনামূলক দুর্বল প্রার্থীদের কাছে এত বিপুল পরিমাণ আসন ছেড়ে দিলে তা সরাসরি জামায়াতে ইসলামীর দখলে চলে যাবে। অলি আহমেদ যে মূলত পর্দার আড়ালে জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়নের পক্ষেই কাজ করছিলেন, পরবর্তীতে জামায়াতে জোটে তার যোগদানের মাধ্যমেই সেই সত্যের চাক্ষুষ প্রমাণ মিলেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নিজের পারিবারিক ও ছাত্রজীবনের সংগ্রামের কথা তুলে ধরে রাশেদ খাঁন বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন ও ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে যখন তিনি রাজপথে সক্রিয় ছিলেন এবং তার মুক্তির দাবিতে তার বাবা-মা আন্দোলন করেছিলেন, সেসময় কর্নেল অলি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার খপ্পরে আটকা পড়েছিলেন। তিনি নিজেকে একজন সাধারণ শ্রমিকের সন্তান হিসেবে গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করে জানান যে, তার চৌদ্দগোষ্ঠীর মধ্যে একমাত্র তিনিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন এবং দীর্ঘ আট বছর ধরে অর্থাৎ ১৮ সাল থেকে ২৪ সাল পর্যন্ত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে একজন সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছেন। অথচ একজন প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা হয়েও অলি আহমেদ ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে গিয়ে তার বাবা-মাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি নিজেই নিজের বংশ ও পারিবারিক সংস্কৃতির পরিচয় ফুটিয়ে তুলেছেন। পরিশেষে রাশেদ খাঁন দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, জামায়াতের রাজনীতি বা তাদের জোটে ভিড়লে মানুষের বিচারবুদ্ধি ও হিতাহিতজ্ঞান কীভাবে বিসর্জন যায়, কর্নেল অলি আহমেদ নিজেই তার বর্তমান বাস্তব ও নিকৃষ্টতম উদাহরণ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা ও বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়েছে, যা নিয়ে সাধারণ নেতাকর্মীদের মাঝেও নানা আলোচনা চলছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সরদার জহুরুল ইসলামের দক্ষ ও সুশৃঙ্খল সঞ্চালনায় আয়োজিত উক্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির মহামান্বিত আসনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। এছাড়া অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মূল্যবান বক্তব্য রাখেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রশাসন অধ্যাপক ড. আব্দুল আলিম এবং উপ-উপাচার্য শিক্ষা অধ্যাপক ড. মামুনুর রশীদ মামুন সহ দেশের উচ্চশিক্ষা ও রাজনীতিজগতের অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। সমগ্র অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্বের দায়িত্ব পালন করেন রাবি শাখা ছাত্রদলের গতিশীল সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী। সভায় উপস্থিত প্রধান বক্তা ও অতিথিবৃন্দ ছাত্ররাজনীতির অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের বিভিন্ন দিক নিয়ে তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের মূল বক্তব্যে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির আরও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন যে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পবিত্র ও ঐতিহাসিক মাটি থেকে তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে চান যে, দেশের প্রতিটি ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে যারা বিভিন্ন ধরনের বিকৃত মানসিকতা ও অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত রয়েছে, তাদের প্রতি তীব্র ধিক্কার ও ঘৃণা প্রকাশ করা উচিত। সেই সঙ্গে দেশের আপামর সাধারণ শিক্ষার্থীকে এই ধরণের সকল নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের সম্পূর্ণরূপে দূরে রাখার দৃঢ় আহ্বান জানান তিনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামকে স্মরণ করে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই ও রাজপথের সংগ্রামে একমাত্র ছাত্রসংগঠন হিসেবে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার এবং অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং এর মূল অঙ্গসংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে গিয়ে এই সংগ্রামী সংগঠনের প্রায় ১৪২ জন দামাল নেতাকর্মী নিজেদের অমূল্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। শহীদ ওয়াসিম, শহীদ রাব্বি সহ যাঁরা সেদিন রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিলেন, তাদের মূল স্বপ্ন ও লক্ষ্য ছিল একটি সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক, সাম্যভিত্তিক ও মানবিক মর্যাদা সম্পন্ন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা।
স্মরণসভায় উপস্থিত অন্যান্য বক্তারাও অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের দমন-পীড়ন, খুন, গুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অত্যন্ত দূরদর্শী ও সরাসরি দিকনির্দেশনায় ছাত্রদলসহ রাজপথের অন্যান্য সমমনা গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো নিরলস ও আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে গেছে। বিগত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ আন্দোলনের সেই কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জিত হয়। বক্তারা দেশের জন্য শহীদ হওয়া প্রতিটি বীর সেনার আত্মত্যাগের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে সকল ছাত্রসংগঠনকে দায়িত্বশীল ও সংযত আচরণ করার কঠোর তাগিদ দেন। অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে আয়োজিত এই স্মরণসভার সমাপ্তি পর্বে জুলাইয়ের শহীদদের পবিত্র আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে বিগত আন্দোলন চলাকালে পঙ্গুত্ববরণকারী ও আহত নেতাকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়।