প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
উত্তরবঙ্গের ব্যস্ততম মহাসড়কগুলোতে বেড়েই চলেছে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা, যা কেড়ে নিচ্ছে শত শত তাজা প্রাণ। তেমনি এক হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে গেছে বগুড়ার শেরপুর উপজেলা। গত রবিবার গভীর রাতে মহাসড়কের ওপর বিকল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ভারী ট্রাকের পেছনে দ্রুতগামী যাত্রীবাহী বাসের সজোরে ধাক্কায় বাসের চালকের সহকারীসহ অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় আরও অন্তত সাতজন যাত্রী গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে সংঘটিত এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী সাধারণ যাত্রী ও চালকদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে প্রাপ্ত বিস্তারিত তথ্যানুযায়ী, গত রবিবার রাতে জয়পুরহাট জেলা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী যমুনা লাইন পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস ঢাকার উদ্দেশ্যে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছিল। বাসটি যখন বগুড়ার শেরপুর উপজেলার অন্তর্গত জনবহুল ছোনকা বাজার এলাকা অতিক্রম করছিল, তখন নিয়ন্ত্রণহীন গতির কারণে এই মারাত্মক দুর্ঘটনাটি ঘটে। এর ঠিক আগেই মহাসড়কের ওপর ত্রুটি দেখা দেওয়ায় একটি ট্রাক বিকল হয়ে সম্পূর্ণ অচল অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল। রাতের অন্ধকার ও পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সিগন্যালের অভাবে ঢাকাগামী দ্রুতগামী যমুনা লাইন পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ওই ট্রাকটির ঠিক পেছনের অংশে সজোরে ও অত্যন্ত ভয়াবহভাবে ধাক্কা দেয়। বাসের অতিরিক্ত গতির কারণে ধাক্কার তীব্রতা এতটাই প্রচণ্ড ছিল যে, বাসটির সামনের অংশ পুরোপুরি দুমড়েমুচড়ে যায় এবং ভেতরে থাকা যাত্রীদের মাঝে চিৎকার ও কান্নাকাটি পড়ে যায়।
এই মর্মান্তিক ও আকস্মিক দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান দুজন দুর্ভাগা ব্যক্তি। নিহতদের মধ্যে একজনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে, তিনি হলেন দুর্ঘটনা কবলিত বাসটির চালকের সহকারী বা হেল্পার নয়ন (৩৮), যিনি পার্শ্ববর্তী নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলার জাহানপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। অপর নিহত ব্যক্তি হলেন একই উপজেলার চানপুরি গ্রামের বাসিন্দা মাসুদুর রহমান (৩৮), যিনি পেশায় একজন সাধারণ কাঁচামাল ব্যবসায়ী ছিলেন এবং কাজের প্রয়োজনে বাসে চড়ে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। বাস এবং ট্রাকের এই মুখোমুখি ও পেছন থেকে সংঘটিত সংঘর্ষের ফলে বাসের ভেতরে থাকা অন্যান্য যাত্রীরাও গুরুতর আঘাত পান। দুর্ঘটনার বিকট শব্দ শুনে স্থানীয় লোকজন দ্রুত ছুটে আসেন এবং নিজেদের উদ্যোগে উদ্ধারকাজ শুরু করার পাশাপাশি তাৎক্ষণিকভাবে শেরপুর ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশকে খবর দেন। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফায়ার সার্ভিসের একটি চৌকস দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে।
উদ্ধারকারী দল দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির ভেতর থেকে অত্যন্ত কষ্টকর পরিস্থিতিতে আটকে পড়া হতাহত যাত্রীদের একে একে বাইরে বের করে আনে। গুরুতর আহত অবস্থায় অন্তত সাতজন যাত্রীকে দ্রুত উদ্ধার করে বগুড়ার উন্নত চিকিৎসার সর্ববৃহৎ কেন্দ্র শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আহতদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে, ঘটনাস্থলে নিহত হওয়া চালকের সহকারী নয়ন ও ব্যবসায়ী মাসুদুর রহমানের মরদেহ উদ্ধার করে শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের কাছে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য হস্তান্তর করা হয়। নিহতদের স্বজনদের কান্নায় হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে, যা উপস্থিত সকলের হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
এই দুঃখজনক দুর্ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক সাজ্জাদুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, প্রাথমিক তদন্ত ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ধারণা করা হচ্ছে অতিরিক্ত গতির কারণেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। রাতের অন্ধকারে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোর ফলে চালক সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিকল ট্রাকটিকে সময়মতো দেখতে পাননি অথবা নিয়ন্ত্রণ রাখতে ব্যর্থ হন, যার ফলে এই অনভিপ্রেত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পরপরই পুলিশ প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে দুর্ঘটনা কবলিত যাত্রীবাহী বাস ও ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাকটিকে জব্দ করে নিজেদের কঠোর পুলিশি হেফাজতে নিয়ে এসেছে। এই ঘটনায় সড়ক পরিবহন আইনে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণের কাজ চলমান রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। মহাসড়কে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি রোধ করতে ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রতিপালন এবং বিকল গাড়িগুলো দ্রুত অপসারণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।