রূপপুরে বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে না আগস্টে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার
রূপপুরে বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে না আগস্টে

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনার অপেক্ষায় থাকা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চলতি আগস্ট মাসে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার যে সোনালী স্বপ্ন দেখা হচ্ছিল, তা আপাতত বাস্তবে রূপ নিচ্ছে না। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে চলতি মাসেই প্রায় তিন শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, কিছু অনিবার্য কারিগরি ধাপ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে সেই লক্ষ্যমাত্রা এখন কিছুটা পেছাতে বাধ্য হয়েছে। পারমাণবিক চুল্লির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও প্রযুক্তিগতভাবে জটিল একটি মেগা প্রকল্পে নিরাপত্তার সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপস না করার নীতিগত অবস্থানের কারণেই মূলত এই সময়ক্ষেপণ ঘটেছে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।

প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে প্রাপ্ত বিস্তারিত তথ্যে জানা যায় যে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কাজ ইতোমধ্যে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গেই সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। গত এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে এই প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টরে পারমাণবিক জ্বালানি সংযোজন বা লোডিং প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছিল। এরপর থেকেই শুরু হয় একের পর এক অত্যন্ত নিখুঁত জ্বালানি সংযোজন এবং প্রাথমিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা। দেশের প্রকৌশলী ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেই প্রাথমিক ধাপের পরীক্ষাগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হলেও, বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর ধাপটি এখনো বাকি রয়েছে।

পারমাণবিক বিজ্ঞানের ভাষায় এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপটিকে বলা হয় ‘ক্রিটিক্যালিটি’, যার অর্থ হলো রিঅ্যাক্টরের ভেতরে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল উপায়ে পারমাণবিক বিক্রিয়া বা চেইন রিঅ্যাকশন শুরু করা। এই ধাপে পদার্পণ করার আগে দেশের পারমাণবিক খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বা বায়েরার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বি-২’ বা দ্বিতীয় ধাপের কমিশনিং লাইসেন্স বা অনুমোদনপত্র হাতে পাওয়া বাধ্যতামূলক। এই বিশেষ লাইসেন্স বা আইনি ও কারিগরি অনুমোদন লাভ করা ছাড়া কোনোভাবেই রূপপুর প্রকল্পের রিঅ্যাক্টরে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরবর্তী ধাপে যাওয়া আইনগত ও নিরাপত্তার দিক থেকে সম্পূর্ণ অসম্ভব। ফলশ্রুতিতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আশা সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে গেছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহিদুল হাসান সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট করেছেন যে, প্রথম ইউনিটটি বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একেবারে অন্তিম ও চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার পূর্ববর্তী সকল অনুমোদন প্রাপ্তির পর জ্বালানি সংযোজন থেকে শুরু করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নব্বইটিরও বেশি নিরাপত্তা ও কারিগরি পরীক্ষা সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন কেবল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন এবং তাদের সবুজ সংকেত পাওয়ার অপেক্ষা। বায়েরা কর্তৃপক্ষ কাঙ্ক্ষিত লাইসেন্স প্রদান করলেই কেবল পরবর্তী ধাপে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।

তবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন যে, বায়েরার কাছ থেকে লাইসেন্স হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু রাতারাতি বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব নয়। লাইসেন্স পাওয়ার পর প্রথম কাজ হবে রিঅ্যাক্টরের ভেতরে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে পারমাণবিক বিক্রিয়া চালু করা। এরপর আরও দীর্ঘ চার থেকে ছয় সপ্তাহব্যাপী বিভিন্ন ধরনের পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং শেষ মুহূর্তের কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। এই সমস্ত ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করার পরই কেবল পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ শুরু করা অবধারিতভাবে সম্ভব হবে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে আরও কিছুটা সময় প্রয়োজন।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. মাহামুদুল হাসান এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন যে, পারমাণবিক শক্তি খাতের মতো অতি সংবেদনশীল ক্ষেত্রে এই ধরনের লাইসেন্স বা ছাড়পত্র প্রদান অত্যন্ত জটিল এবং সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল একটি প্রক্রিয়া। প্রকল্পের সার্বিক নিরাপত্তা, সম্পন্ন হওয়া প্রতিটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার চুলচেরা ফলাফল এবং আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার নির্ধারিত সকল আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পুরোপুরি পূরণ হয়েছে কি না, তা শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল লাইসেন্স দেওয়ার প্রশ্ন আসে। তবে ঠিক কবে নাগাদ বা কোন নির্দিষ্ট তারিখে এই ঐতিহাসিক অনুমোদন প্রদান করা সম্ভব হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা উল্লেখ করতে পারেননি।

রূপপুর প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ও দেশের প্রথিতযশা পরমাণু বিজ্ঞানী ড. শৌকত আকবরও এই বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত পোষণ করে বলেছেন যে, পারমাণবিক শক্তির মতো একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও সুউচ্চ প্রযুক্তির প্রকল্পে নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই কোনো ধরনের আপস করার ন্যূনতম সুযোগ থাকে না। সামান্যতম অবহেলারও এখানে কোনো স্থান নেই, তাই প্রতিটি খুঁটিনাটি ধাপ অত্যন্ত নিখুঁত ও ত্রুটিহীনভাবে সম্পন্ন করেই কেবল পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে হয়। আন্তর্জাতিক সব প্রটোকল এবং দেশীয় নিরাপত্তা আইন কঠোরভাবে অনুসরণ করার ফলেই এই পদক্ষেপে কিছুটা দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে, যা দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই অপরিহার্য।

রাশিয়ার সর্বাধুনিক আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর নামক জনপদে প্রায় বারো দশমিক পঁয়ষট্টি বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিশাল ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসের এই প্রথম ও সর্ববৃহৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই মেগা প্রকল্পে রাশিয়ার তৈরি অত্যন্ত উন্নতমানের দুটি ভিভিইআর-১২০০ মডেলের পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হয়েছে, যার প্রতিটির একক উৎপাদনক্ষমতা হলো এক হাজার দুই শ মেগাওয়াট। উভয় ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে এই কেন্দ্রটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা গিয়ে দাঁড়াবে দুই হাজার চার শ মেগাওয়াটে, যা দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার একটি বিরাট অংশ পূরণ করে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এক যুগান্তকারী বিপ্লব সাধন করবে। বর্তমান সামান্য এই বিলম্বকে তাই বড় কোনো ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে একটি অবশ্যম্ভাবী প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত