প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসিের তালিকা থেকে একটি টেকসই, মসৃণ ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল উত্তরণের পথ সুগম করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ সরকার ২০২৬ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত মেয়াদী অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি জাতীয় রোডম্যাপ বা পথনকশার খসড়া তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে এবং উত্তরণ-পরবর্তী যেকোনো চ্যালেঞ্জ সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতেই এই বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমা অনুসারে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর যে জোরালো আবেদন করা হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় এই বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। পরিকল্পনাটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি সার্বক্ষণিক তদারকি ও মূল্যায়নের জন্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অধীনে একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ড্যাশবোর্ড চালুর যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই প্রস্তাবিত ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত চৌদ্দটি প্রধান কর্মক্ষমতা সূচক অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। বর্তমান সরকারের সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী লক্ষ্য হলো ২০২৯ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সাত শতাংশে উন্নীত করা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কমিয়ে তা ছয় শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা। একই সঙ্গে দেশের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য কর ও জিডিপির অনুপাত কমপক্ষে নয় শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মজুত আরও শক্তিশালী করে তা অন্তত ছয় মাসের আমদানি খরচের সমপরিমাণে উন্নীত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক দারুণ স্বস্তি ও স্থায়িত্ব প্রদান করবে।
ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় ক্ষত হিসেবে পরিচিত খেলাপি ঋণের হার কমাতে অত্যন্ত কঠোর ও সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ত্রিশ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও, ২০২৯ সালের মধ্যে তা বিশ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার সুদৃঢ় পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ ও প্রবৃদ্ধি দশ শতাংশের ওপরে ধরে রাখা, দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য খাতের রপ্তানি অংশ অন্তত পঁচিশ শতাংশে উন্নীত করা, বন্দরগুলোতে কনটেইনার খালাসের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে তা দশ দিন থেকে নামিয়ে এনে মাত্র এক থেকে দুই দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা এবং সরকারের সব ধরনের ব্যবসায়িক সেবা একশ শতাংশ ডিজিটাল ও সমন্বিত করার যুগান্তকারী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়াও দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে অতিরিক্ত ত্রিশ লাখ দক্ষ শ্রমিক তৈরি, জাতীয় জ্বালানি চাহিদার নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ পনের শতাংশে উন্নীত করা, নতুন ব্যবসা অনুমোদনের সময়সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো, আন্তর্জাতিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, সরকার স্বীকৃত পরীক্ষাগারের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা ইএসজি অর্থাৎ পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসন কঠোরভাবে অনুসরণকারী রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়েও বিশেষ নজর রাখা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছে যে, উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর বাড়ানোর এই আবেদন কোনোভাবেই দেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়ার বা উত্তরণ প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার কোনো কূটকৌশল নয়; বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিশ্বব্যাপী চলমান জ্বালানি সংকট এবং পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার মাঝে দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন করার এটি এক সুবর্ণ সুযোগ।
এই রোডম্যাপের মূল ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে সামষ্টিক অর্থনীতির সার্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা, দেশের উৎপাদনশীলতা ও শিল্প খাতের উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ নিশ্চিত করা, উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে বিশ্ববাজারে কোটা ও শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা টিকিয়ে রাখা এবং সুশাসন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আরও শক্তিশালী করা। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সফল করতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব, নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে এর আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও বিভিন্ন উন্নয়ন অংশীদারদের কাছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই বাস্তবসম্মত ও সময়ভিত্তিক সংস্কার রোডম্যাপের রূপরেখা অত্যন্ত সফলভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।