হামের চিকিৎসায় ঋণগ্রস্ত ৮৯ শতাংশ পরিবার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার
হামের চিকিৎসায় ঋণগ্রস্ত ৮৯ শতাংশ পরিবার

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শিশুদের অতি পরিচিত একটি রোগ হিসেবে পরিচিত হলেও হামের প্রাদুর্ভাব যে কেবল একটি সাধারণ জনস্বাস্থ্যের সংকটমাত্র নয়, বরং তা দেশের নিম্ন আয়ের হাজারো অসহায় ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য এক ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয় ডেকে আনে, তা সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সরকারি বা জনস্বাস্থ্য হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবা বিনামূল্যে পাওয়ার কথা থাকলেও প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাতায়াত খরচ, রোগীর সঙ্গে হাসপাতালে অবস্থানকালীন আনুষঙ্গিক ব্যয় এবং খাবার মেটাতে গিয়ে মারাত্মক বিপাকে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে যাওয়া পরিবারের প্রায় ৮৯ শতাংশকেই বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ বা ধারদেনা করতে হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, প্রতি দশটি পরিবারের প্রায় নয়টি পরিবারই তাদের প্রিয় সন্তানের চিকিৎসা চালাতে ঋণের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি বা বিডিআরসিএস এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ বা আইএফআরসির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জরিপে এই উদ্বেগজনক তথ্যগুলো উঠে এসেছে। সোমবার এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই জরিপের বিস্তারিত ফলাফল প্রকাশ করা হয়। দেশের মোট বারোটি সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং বিভিন্ন জেলা হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা গ্রহণকারী দুই হাজার সাতচল্লিশটি পরিবারের সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে। হামের মতো একটি সংক্রামক রোগ কীভাবে দরিদ্র পরিবারের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে, তার এক বাস্তব ও হৃদয়বিদারক চিত্র ফুটে উঠেছে এই জরিপে।

উক্ত জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, চিকিৎসার চড়া খরচ জোগাতে আক্রান্ত পরিবারগুলোর প্রায় একষট্টি শতাংশকেই তাদের জীবনের কষ্টের জমানো সঞ্চয় বা পুঁজিপাট্টা ভেঙে ফেলতে হয়েছে। এ ছাড়াও চার শতাংশ পরিবার তাদের সর্বস্ব বা শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে এবং মাত্র তিন শতাংশ পরিবার বিভিন্ন ধরনের দান বা মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে দিন কাটিয়েছেন। হামের এই মারাত্মক আর্থিক অভিঘাত কেবল চিকিৎসা খরচের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পারিবারিক উপার্জনেও। বহু অভিভাবক ও মা-বাবা তাদের মুমূর্ষু সন্তানের পাশে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা থাকতে গিয়ে তাদের নিয়মিত কর্মস্থলে বা কাজে যেতে পারেননি। ফলস্বরূপ, তারা তাদের দৈনিক মজুরি হারিয়েছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের মাসিক আয় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মস্থলে দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে চাকরি হারানোর মতো নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখিও হতে হয়েছে অনেককে। বিশেষ করে দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতে বা দিনমজুর হিসেবে কর্মরত দরিদ্র পরিবারগুলো এই পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জরিপের পরিসংখ্যানে আরও প্রকাশ পেয়েছে যে, হামে আক্রান্ত একজন রোগীর চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক খাতে গড়ে প্রায় পনেরো হাজার ছয়শত এগারো টাকা খরচ হয়েছে, যা আনুমানিক ষোলো হাজার টাকার সমান। তবে পরিস্থিতি ভেদে কোনো কোনো হতদরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা ব্যয় সর্বমোট পঁয়ষট্টি হাজার টাকা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে, যা তাদের বার্ষিক আয়ের প্রায় সমান। এই জরিপে অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলোর মধ্যে প্রায় আটাত্তর শতাংশ পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ব্যক্তিরাই দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতে কায়িক পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এসব পরিবারের মাসিক আয়ের চিত্র অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও আশঙ্কাজনক। প্রায় চল্লিশ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় মাত্র দশ থেকে পনেরো হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ; বত্রিশ শতাংশ পরিবারের আয় ছয় থেকে দশ হাজার টাকা; ষোল শতাংশ পরিবারের আয় পনেরো থেকে কুড়ি হাজার টাকা এবং বাকি বারো শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ছয় হাজার টাকারও অনেক নিচে।

আক্রান্ত রোগীদের বয়স বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এই ভয়াবহ রোগের শিকার হওয়া রোগীদের মধ্যে প্রায় পঁয়াত্তর শতাংশেরই বয়স চার বছরের কম। পাঁচ থেকে সতেরো বছর বয়সী শিশু ও কিশোর রয়েছে উনিশ শতাংশ এবং আঠারো বছরের বেশি বয়সি রোগী রয়েছে মাত্র ছয় শতাংশ। অর্থাৎ এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, হামের আক্রমণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমাদের সমাজের সবচেয়ে কোমল ও অল্পবয়সী শিশুরা, যাদের দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যায় রেখে চিকিৎসা করাতে হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে বিচার করলে, এই জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের মধ্যে বত্রিশ শতাংশ ঢাকার, বাইশ শতাংশ চট্টগ্রামের, বিশ শতাংশ বরিশালের, আঠারো শতাংশ ময়মনসিংহের, রাজশাহী ও রংপুরের তিন শতাংশ করে, খুলনার দুই শতাংশ এবং সিলেটের এক শতাংশ পরিবার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিটি পরিবারই তাদের এই দুর্দিনে কোনো না কোনো ধরনের জরুরি আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ পঁয়ত্রিশ শতাংশ পরিবার চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় ওষুধকে তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি সহায়তা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ ছাড়াও তেত্রিশ শতাংশ পরিবার বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি তথা ওয়াশ সহায়তা, বাইশ শতাংশ খাদ্য সহায়তা, এগারো শতাংশ যাতায়াত ব্যয় নির্বাহের জন্য সহায়তা, তিন শতাংশ বাড়ি ভাড়া এবং দুই শতাংশ পরিবার যোগাযোগ ব্যয়ের ক্ষেত্রে আর্থিক সহযোগিতার আবেদন জানিয়েছে। মূলত সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদান করার মহৎ উদ্দেশ্যেই এই মূল্যায়ন পরিচালনা করা হয়েছিল। মূল্যায়নের ভিত্তিতে দুই হাজার সাতচল্লিশটি পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দুই হাজার চারশ পরিবারকে নির্বাচন করে তাদের প্রত্যেককে নগদ দশ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।

রংপুরের হাজেরা খাতুনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এই ভয়াবহ পরিস্থিতির একটি জীবন্ত দলিল। গত জুন মাসে তিনি তার মাত্র এগারো মাস বয়সি কচি মেয়েকে কোলে নিয়ে সুদূর রংপুর থেকে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছিলেন চিকিৎসার জন্য। মেয়েকে সুস্থ করে তুলতে তুলতে এই পর্যন্ত তাদের পরিবারের খরচ হয়েছে সত্তর হাজার টাকারও বেশি। গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন যে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা বিনামূল্যে পাওয়া গেলেও অ্যাম্বুলেন্সের চড়া ভাড়া, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রোগীর পথ্য ও খাবার এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ধার করতে হয়েছে। তার স্বামী সৌদি আরবে একজন সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও সেই নির্দিষ্ট মাসে কোনো বেতন না পাওয়ায় তাদের ওপর ঋণের বোঝা আরও মারাত্মকভাবে চেপে বসেছে।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল ড. কবির এম আশরাফ আলম এই পরিস্থিতি সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, মাঠপর্যায়ের মূল্যায়নে এটি অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে, হামের শিকার হওয়া এসব সাধারণ পরিবার কেবল মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতেই পতিত হচ্ছে না, বরং তারা এক অপূরণীয় ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটের মুখেও পড়ে যাচ্ছে। সমাজের এই চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নগদ অর্থ সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয় কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ফেডারেশনের বা আইএফআরসির হেড অব ডেলিগেশন আলবার্তো বোকানেগ্রা অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, হামের এই ক্ষতিকর প্রভাব কেবল হাসপাতালের চার দেওয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অসুস্থ শিশু বা পরিবারের অতি প্রিয় সদস্যটির সেবা-শুশ্রূষা করতে গিয়ে বহু পরিবার তাদের নিয়মিত উপার্জন হারিয়ে চরম দেউলিয়া হয়ে পড়ছে। এই সংকট উত্তরণের জন্য মানবিক সহায়তার পাশাপাশি একটি শক্তিশালী ও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলা সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, দেশের প্রচলিত নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতা ও পরিধি আরও শক্তিশালী ও জনমুখী করার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের হামে আক্রান্ত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি আর্থিক সহায়তা এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত বাড়তি ব্যয় কমানোর সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় চিকিৎসার এই লাগামহীন খরচ দেশের বহু সাধারণ পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি ও সর্বগ্রাসী ঋণের জালে আবদ্ধ করে চরম দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে চিরতরে ঠেলে দেবে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত