প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়ন যেমন মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজতর করেছে, তেমনি এর অপব্যবহারের মাধ্যমে সমাজে একশ্রেণির অসাধু চক্র নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে যাচ্ছে, যা সামাজিক শৃঙ্খলা ও ব্যক্তির মর্যাদাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো আধুনিক ও সংবেদনশীল প্রযুক্তির অপব্যবহার করে মানহানিকর ও কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর শিকার হয়ে এবার মৌলভীবাজার জেলার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আসনের সংসদ সদস্য এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সম্মানিত সদস্য এম নাসের রহমানকে নিয়ে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি অশ্লীল ভিডিও তৈরি করা হয়েছে। এই ঘৃণ্য ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মৌলভীবাজার সদর মডেল থানায় দায়েরকৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ সাইবার মামলায় এজাহারনামীয় প্রধান এক আসামিকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ বা ডিবি অত্যন্ত সফলভাবে গ্রেপ্তার করেছে, যা পুরো অঞ্চলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত ওই ব্যক্তির নাম সৈয়দ তানভীর আহমেদ এবং তার বয়স ত্রিশ বছর। বর্তমানে তিনি মৌলভীবাজার পৌরসভার ঘনবসতিপূর্ণ বেড়িরপাড় এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হলেও তার পূর্বের পৈতৃক বাড়ি ছিল জুড়ী উপজেলায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন এলাকায় বসবাস করে আসছেন। নিজেকে একজন প্রতিষ্ঠিত ফার্মের প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দিলেও বেড়িরপাড় এলাকায় তার একটি নিজস্ব ব্যবসায়িক ফার্ম রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অত্যন্ত সুকৌশলে এ ধরনের একটি মানহানিকর অপরাধের সঙ্গে তার জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি চৌকস দল গত সোমবার রাতে শ্রীমঙ্গল এলাকা থেকে তাকে আটক করতে সফল হয়। গত সোমবার রাত আনুমানিক নয়টার দিকে এই সাড়াঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।
মামলার এজাহার ও অভিযোগ সূত্রে আরও জানা যায় যে, মৌলভীবাজার-৩ অর্থাৎ সদর ও রাজনগর আসনের অত্যন্ত জনপ্রিয় সংসদ সদস্য এবং প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা এম নাসের রহমানের রাজনৈতিক সুনাম, সামাজিক সম্মান এবং ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করার অসৎ উদ্দেশ্যে একটি সংঘবদ্ধ কুচক্রী মহল দীর্ঘদিন ধরে ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো শক্তিশালী প্রযুক্তি অপব্যবহার করে তার শ্রদ্ধেয় মুখাবয়ব ও ছবি বিকৃত করে একটি চরম অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ ভিডিও প্রস্তুত করা হয়। পরবর্তীতে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সেই মিথ্যা ও বানোয়াট ভিডিওটি ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করে দেওয়া হয়, যাতে সাধারণ মানুষের মাঝে ওই নেতার জনপ্রিয়তায় ধস নামে। প্রযুক্তির এমন অপব্যবহার করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের হেয় প্রতিপন্ন করার এই অপচেষ্টা সমাজের সচেতন মহলকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
এই ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এবং এর যথাযথ আইনগত প্রতিকার চেয়ে অ্যাডভোকেট নিয়ামুল হক বাদী হয়ে গত গত ২ আগস্ট মৌলভীবাজার সদর মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর মৌলভীবাজার সদর মডেল থানার পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তা আমলে নেয় এবং এর গুরুত্ব বিবেচনা করে মামলাটি রেকর্ড করে। মামলার স্পর্শকাতরতা এবং প্রযুক্তিগত বিষয় জড়িত থাকায় এর মূল তদন্তভার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ বা ডিবির ওপর ন্যস্ত করা হয়। ডিবির অভিজ্ঞ তদন্তকারী কর্মকর্তারা অত্যন্ত পেশাদারিত্ব ও সাইবার অপরাধ দমনের আধুনিক কলাকৌশল প্রয়োগ করে আসামিকে শনাক্ত করতে সক্ষম হন। মৌলভীবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, ডিবি পুলিশ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অভিযান চালিয়ে এই মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে এবং বর্তমানে পুরো মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে।
মৌলভীবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি সুদীপ্ত এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে নিশ্চিত করেছেন যে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে সোমবার রাত নয়টায় শ্রীমঙ্গল থেকে আসামি সৈয়দ তানভীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং এই অপকর্মের সঙ্গে আরও কোনো চক্র বা ব্যক্তি জড়িত রয়েছে কি না, তা উদ্ঘাটনের জন্য পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। সাইবার অপরাধ দমনে বর্তমান প্রশাসনের জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি জানান যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে এ ধরনের অপপ্রচার, মানহানি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ডিপফেক বা অশ্লীল কনটেন্ট তৈরি ও বিস্তারকারীদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের জঘন্য অপরাধ করার সাহস না পায়।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের বা সাধারণ মানুষের মানহানি করার এই সংস্কৃতি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। রাজনীতি ও সামাজিক পরিমণ্ডলে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে এবং ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে এ ধরনের সাইবার অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। মৌলভীবাজারের এই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে সাইবার অপরাধীদের বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, প্রযুক্তির আড়ালে লুকিয়ে থেকে অপরাধ করে পার পাওয়া সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিক সমাজ এই ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো কুচক্রী মহল এ ধরনের জঘন্য অপকর্ম করার দুঃসাহস দেখাতে না পারে এবং সমাজে সুস্থ সাইবার সংস্কৃতি বজায় থাকে।