প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান নানা আলোচনা, বিতর্ক এবং দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত কড়া ও স্পষ্ট ভাষায় মন্তব্য করে রীতিমতো রাজনৈতিক মহলে এক ধরনের চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। সাম্প্রতিক এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি দাবি করেছেন যে, দেশের ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে এবং ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে জামায়াতে ইসলামী আদতে ইসলামের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি সাধন করেছে। তার এই মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনের শীর্ষ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সরকারের দায়িত্বশীল পদে থেকে একজন মন্ত্রীর এ ধরনের কঠোর অবস্থান দেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
গত সোমবার রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা কলেজের শহিদ আ ন ম নজীব উদ্দিন খান খুররম অডিটোরিয়ামে শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের উদ্যোগে ‘অগ্নিঝরা জুলাই, সংগ্রামের সুর’ শীর্ষক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর দেশের বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড, বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও কড়া মন্তব্য করেন। বিশেষ করে ধর্মকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করা দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন। তিনি উপস্থিত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উদ্দেশে সরাসরি প্রশ্ন রেখে বলেন যে, জামায়াতে ইসলামী কি কখনো ইসলামের প্রকৃত ঠিকাদার হতে পারে? তার মতে, এর উত্তর সম্পূর্ণ নেতিবাচক, কারণ বাহ্যিক লেবাস ও ধর্মের কথা বললেও বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই দলটিই মূলত ইসলামের মূল চেতনার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে।
বর্তমান সময়ের সাইবার রাজনীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপপ্রচারের বিষয়টি তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী নুর আরও বলেন যে, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে বর্তমানে নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে। এখন বিভিন্ন চতুর পন্থায় সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া ভিডিও এবং মনগড়া ফটোকার্ড তৈরি করে সরকারি দলের বিভিন্ন নেতা কিংবা সরকারের অংশীদার হিসেবে যারা জোটে রয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হচ্ছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে গিয়ে যখন দেশ গড়ার কাজ চলছে, তখন একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহল এ ধরনের অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, এসব অপকৌশলের পেছনে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
দেশের সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং বর্তমান রাজনৈতিক মেজাজ বিশ্লেষণ করে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানান যে, দীর্ঘ সতেরো বছর ধরে চলা এক কঠিন স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দেশের সাধারণ মানুষ এই মুহূর্তে যেকোনো ধরনের সংঘাতময় আন্দোলন বা অস্থিতিশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। জনগণ এখন আর মাঠে নেমে সংঘাত বা হঠকারী আন্দোলন-সংগ্রামের রাজনীতি মোটেও পছন্দ করছে না। অথচ বর্তমান সরকারের বয়স এখনো ছয় মাসও পূর্ণ হয়নি, এর মধ্যেই একশ্রেণির রাজনৈতিক দল অযৌক্তিকভাবে সরকারবিরোধী আন্দোলন ও উত্তেজনাকর সংগ্রামের ডাক দিয়ে চলেছে, যা দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
সরকারবিরোধী হঠকারী আন্দোলনকারীদের কঠোর ভাষায় প্রশ্নবিদ্ধ করে তিনি বলেন যে, ধরুন যদি কোনো কারণে বর্তমান সরকার হঠাৎ করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব ছেড়ে দেয়, তবে তাদের উত্তরসূরি হিসেবে দেশ ও রাষ্ট্র পরিচালনার মতো যোগ্য ও বিকল্প কে আছে? এই মুহূর্তে দেশের সামনে যে জটিল ভূরাজনৈতিক বা জিওপলিটিক্যাল সংকট বিরাজ করছে, তা সফলভাবে মোকাবিলা করে বাংলাদেশকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো সক্ষমতা একমাত্র বিএনপি সরকারের পক্ষেই সম্ভব, অন্য কোনো বিকল্প শক্তি এই মুহূর্তে দৃশ্যপটে নেই বলে তিনি জোরালো মন্তব্য করেন। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি বিশেষভাবে জোর দেন।
আলোচনা সভায় বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা মূল্যায়ন করতে গিয়ে এনসিপি বা নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কঠোর সমালোচনা করেন প্রতিমন্ত্রী নুর। তিনি অভিযোগ করেন যে, এই মুহূর্তে এনসিপি দেশের রাজনীতিতে এক প্রকার বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে। তারা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরোধী দলে অবস্থান করলেও তাদের উচিত ছিল ধৈর্য ধরে প্রকৃত রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও কলাকৌশল শেখা, কিন্তু তা না করে তারা এমন সব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে যা দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাদের এ ধরনের হঠকারী ও অপরিপক্ব রাজনৈতিক ভূমিকার বিষয়ে দেশবাসীকে সবসময় অত্যন্ত সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে, অন্যথায় দেশের অভ্যন্তরে নতুন করে মারাত্মক সংকট তৈরি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও দাবি করেন যে এনসিপি সম্পূর্ণ নিজেদের স্বকীয় বুদ্ধি, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বা নিজস্ব শক্তিতে রাজনীতি পরিচালনা করছে না। যখন বিগত ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলনের শেষ মুহূর্তে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন এক প্রকার নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, ঠিক সেই উপযুক্ত সময়ে একটি অদৃশ্য বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বা শক্তি তাদের ওপর ভর করেছে। এখন সেই বিদেশি প্রভুদের ইশারায় এই নতুন শক্তিগুলোকে ব্যবহার করে দেশে একটি কৃত্রিম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার পাঁয়তারা চলছে। নির্বাচিত বা দায়িত্বশীল সরকারকে সবসময় চাপের মুখে রেখে বা জিম্মি করে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা লুটার অপচেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন যে, এই ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ষড়যন্ত্র সম্পর্কে দেশের সব সচেতন নাগরিককে সজাগ থাকতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী নুরের এই ধরনের ঝাঁজালো ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য প্রকাশের পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে ও বাইরে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। একদিকে যেমন সরকারের অংশীদার দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার মুখে জামায়াত ও অন্যান্য বিরোধী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে এমন কঠোর সমালোচনা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এর পক্ষে-বিপক্ষে নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে। দেশের সচেতন মহল মনে করছে, গণতন্ত্রের এই উত্তরণকালে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ির চেয়ে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে মনোনিবেশ করাটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি।