দিনে সাড়ে ১২ কোটি লিটার পানি যায় কোথায়?

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার

প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রাম নগরীর বহু বাসিন্দার কাছে বিশুদ্ধ পানি এখনো একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। কোথাও নিয়মিত পানি পাওয়া যায় না, কোথাও আবার পানির চাপ কম, আবার অনেক এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ে পানি সরবরাহ না হওয়ায় মানুষকে বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। অথচ একই সময়ে চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পানি উৎপাদন করছে। প্রশ্ন উঠেছে, উৎপাদিত সেই পানির একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে?

চট্টগ্রাম ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করে। কিন্তু এর প্রায় ২৫ শতাংশ বা সাড়ে ১২ কোটি লিটার পানি ‘সিস্টেম লস’-এর কারণে গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যাচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ পানির আর্থিক মূল্যও কম নয়। ওয়াসার হিসাব অনুযায়ী, শুধু এই অপচয়ের কারণে বছরে প্রায় ১৪৬ কোটি টাকার উৎপাদন ব্যয় রাজস্বে পরিণত হচ্ছে না।

একদিকে উৎপাদিত পানির বড় অংশের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে গ্রাহকদের কাছ থেকে বকেয়া বিল আদায়েও রয়েছে বড় দুর্বলতা। চট্টগ্রাম ওয়াসার গ্রাহকদের কাছে বর্তমানে প্রায় ২৪১ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকের পানির দাম আরও ৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। এ নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠনসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে—নিজেদের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দূর না করেই কেন বাড়তি চাপ দেওয়া হবে সাধারণ গ্রাহকের ওপর?

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ওয়াসার বোর্ড সভায় পানির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। তবে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে গ্রাহক প্রতিনিধি, পেশাজীবী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নিতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখন আলোচনার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, মূল্যবৃদ্ধির আগে ওয়াসা তার দীর্ঘদিনের সিস্টেম লস, পানি চুরি, অবৈধ সংযোগ এবং বকেয়া বিল আদায়ের সমস্যাগুলো কতটা সমাধান করতে পারছে।

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম মো. জানে আলম জানিয়েছেন, পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, ধাপে ধাপে স্মার্ট ও প্রিপেইড মিটার স্থাপন, ডিজিটাল বিলিং ব্যবস্থা চালু এবং অবৈধ সংযোগ বন্ধ করার মাধ্যমে সিস্টেম লস কমানোর চেষ্টা চলছে। আগামী এক বছরের মধ্যে সিস্টেম লস ২৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে বলেও তিনি জানান।

চট্টগ্রাম ওয়াসা গত দেড় দশকে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। নতুন পানি শোধনাগার স্থাপন, পাইপলাইন সম্প্রসারণ এবং আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে সংস্থাটির উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে ওয়াসার দৈনিক পানি উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫৬ কোটি লিটারে পৌঁছেছে।

তবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও পুরোনো সমস্যা এখনো কাটেনি। ওয়াসার নিজস্ব প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সিস্টেম লস দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। কখনো কিছুটা কমলেও আবার তা বেড়ে যাচ্ছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত টানা চার মাস সিস্টেম লস প্রায় ২৫ শতাংশে অবস্থান করেছে।

এই সিস্টেম লসের অর্থ শুধু পাইপলাইনের ছিদ্র দিয়ে পানি বেরিয়ে যাওয়া নয়। এর মধ্যে রয়েছে অবৈধ সংযোগ, পানি চুরি, ত্রুটিপূর্ণ মিটার, ভুল বিলিং এবং ব্যবস্থাপনাগত নানা দুর্বলতা। তবে সিস্টেম লসের প্রকৃত কারণ নিয়ে ওয়াসার বিভিন্ন বিভাগের মধ্যেই রয়েছে ভিন্নমত। প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, পাইপলাইনের লিকেজের কারণে ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম। অন্যদিকে রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করেন, পাইপলাইনের সমস্যাই বড় একটি কারণ।

ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মো. মাকসুদ আলমের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি এক হাজার লিটার পানি উৎপাদনে বর্তমানে খরচ হয় প্রায় ৩২ টাকা। এই হিসাবে প্রতিদিন সাড়ে ১২ কোটি লিটার অপচয় হওয়া পানির পেছনে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৪০ লাখ টাকা। এক বছরে এই অপচয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা।

অর্থাৎ যে পানি উৎপাদনে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার একটি বড় অংশ থেকে কোনো আয় হচ্ছে না। ফলে সংস্থাটির আর্থিক চাপ বাড়ছে এবং সেই চাপ সামাল দিতে গ্রাহকের পানির দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুধু সিস্টেম লস নয়, বকেয়া বিলও ওয়াসার জন্য বড় সমস্যা। এপ্রিল পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, গ্রাহকদের কাছে সংস্থাটির পাওনা প্রায় ২৪০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি গ্রাহকদের কাছে প্রায় ১৭৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৬৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে।

চট্টগ্রামের অনেক বাসিন্দার অভিযোগ, নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও তাঁরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। নগরের বিভিন্ন এলাকায় পানি সরবরাহে অনিয়ম, কম চাপ কিংবা পানির মান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিনের। ফলে সেবার মান উন্নত না করে শুধু মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, পানির দাম বাড়ানোর আগে ওয়াসাকে নিজেদের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কমাতে হবে। সংগঠনটির মতে, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, পানি চুরি বন্ধ করা, অচল মিটার পরিবর্তন, সঠিক বিলিং ব্যবস্থা চালু এবং বকেয়া টাকা আদায়ের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

ক্যাবের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সেবার মান নিশ্চিত না করে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়। সাধারণ গ্রাহককে বাড়তি মূল্য দিতে হলে আগে নিশ্চিত করতে হবে যে তাঁরা নিয়মিত ও মানসম্মত পানি পাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর ব্যবস্থাপনায় পানি একটি মৌলিক সেবা। তাই শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, উৎপাদিত পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। আধুনিক মিটারিং ব্যবস্থা, পাইপলাইন সংস্কার, শক্তিশালী নজরদারি এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

চট্টগ্রাম ওয়াসার সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে পানি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পুরোনো অপচয় কমানো। কারণ প্রতিদিন যে সাড়ে ১২ কোটি লিটার পানি হারিয়ে যাচ্ছে, সেটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি জনগণের অর্থ, পরিবেশের সম্পদ এবং নগরবাসীর অধিকার—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িত।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত