অবৈধ গ্যাস সংযোগে চুনাপাথর কারখানা গুঁড়িয়ে দিল প্রশাসন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার
অবৈধ গ্যাস সংযোগে চুনাপাথর কারখানা গুঁড়িয়ে দিল প্রশাসন

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন এবং চরম ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে রাষ্ট্রীয় গ্যাসের প্রধান সঞ্চালন পাইপলাইন কেটে অবৈধভাবে সংযোগ নেওয়ার এক ভয়ংকর ও চাঞ্চল্যকর অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার প্রবহমান আড়িয়াল খাঁ নদের তলদেশ দিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে চলে যাওয়া তিতাস গ্যাসের উচ্চচাপের মূল সঞ্চালন পাইপলাইন মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে সেখানে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা একটি চুনাপাথর তৈরির কারখানা সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন এই কর্মকাণ্ডের ফলে শুধু যে রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি হচ্ছিল তা নয়, বরং আশপাশের আস্ত একটি জনপদকে এক মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনার মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। প্রশাসনের সময়োপযোগী ও কঠোর এই পদক্ষেপে এলাকায় স্বস্তি ফিরে এলেও পুরো ঘটনায় সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে স্থানীয় সূত্রে জানা যায় যে, সোমবার দুপুরে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের কাজীরচর গ্রামে সহকারী কমিশনার ভূমি লাবনী আক্তার তারানার নেতৃত্বে অত্যন্ত সাহসিকতাপূর্ণ ও সফল এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে কটিয়াদী উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির উচ্চপদস্থ একদল কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী সরাসরি উপস্থিত ছিলেন। কটিয়াদী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গোপন সূত্রে খবর পাওয়ার পর তিতাস গ্যাসের লোকজন ও স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে দেখতে পায় যে, আইন ও নিয়মনীতিকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে গ্যাস চুরির এক সুদূরপ্রসারী ফন্দি আঁটা হয়েছিল। কারখানাটি চালু হওয়ার আগেই সেখানে অত্যন্ত গোপনে তিনটি বিশালাকার চুল্লি নির্মাণ করা হয়েছিল এবং চুল্লিগুলোতে পোড়ানোর জন্য প্রচুর পরিমাণে চুনাপাথর মজুত করা হয়েছিল।

সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় যে, আড়িয়াল খাঁ নদের তলদেশে অবস্থিত তিতাস গ্যাসের উচ্চচাপের মূল পাইপলাইনের লিকেজ বা ছিদ্রস্থল দিয়ে অবিরাম গ্যাস নির্গত হয়ে চলেছে। প্রথমে পানির নিচে ছোট ছোট বুদবুদ উঠতে দেখে স্থানীয় সাধারণ মানুষ বিষয়টি নদীর স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা বা জলজ উদ্ভিদের বুদবুদ বলে মনে করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে পানির ওপর বুদবুদের মাত্রা ও তীব্রতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এবং বাতাসে গ্যাসের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় লোকজনের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। এলাকাবাসী অত্যন্ত সচেতনতার পরিচয় দিয়ে বিষয়টি দ্রুত তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে অবহিত করলে তাদের একটি বিশেষজ্ঞ দল আকস্মিক তদন্ত শুরু করে এবং পাইপলাইন থেকে গ্যাস চুরির এই ভয়াবহ অপচেষ্টার চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়।

স্থানীয় মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের সম্মানিত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক সংবাদমাধ্যমকে অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, এই অবৈধ কারখানাটি স্থাপনের বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ট্রেড লাইসেন্স বা ব্যবসায়িক অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং স্থানীয় প্রশাসন বা ইউপি প্রতিনিধি হিসেবে তাকে এই ব্যাপারে বিন্দুমাত্র কিছু জানানোও হয়নি। গ্যাস লিকেজের আতঙ্কজনক খবর পাওয়ার পর তিনি নিজেই দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে নিশ্চিত হন যে এটি সম্পূর্ণ একটি অবৈধ ও চোরাই কারখানা। এই ধরনের হঠকারী ও জনবহুল এলাকায় জীবননাশক গ্যাস চুরি করে যারা এই কারখানা গড়ে তুলেছে, তাদের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি জানান তিনি।

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক ও কারিগরি অনুসন্ধানে জানা গেছে যে, উচ্চচাপের মূল সঞ্চালন পাইপলাইন থেকে অবৈধভাবে গ্যাস কেটে কারখানার চুল্লিতে সংযোগ নেওয়ার অপচেষ্টা করার ফলেই মূলত এই বিপজ্জনক লিকেজের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে তিতাস গ্যাসের অভিজ্ঞ প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানরা চরম ঝুঁকিপূর্ণ এই লিকেজ সম্পূর্ণ নিরাপদ উপায়ে মেরামতের জন্য দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। এই সফল অভিযানে তিতাস গ্যাসের ময়মনসিংহ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক তথা আঞ্চলিক অপারেশন প্রধান প্রকৌশলী সুমেধ মনি চাকমা, অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্সের ব্যবস্থাপক শামীম হোসেন এবং কিশোরগঞ্জ জোনাল অফিসের দায়িত্বশীল ম্যানেজার মোশাররফ হোসেনসহ প্রশাসনের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে সার্বিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।

অভিযান সমাপ্তির পর সহকারী কমিশনার ভূমি লাবনী আক্তার গণমাধ্যমকে বিস্তারিত জানিয়ে বলেন যে, এই কারখানাটি পুরোপুরি চালু হওয়ার আগেই সেখানে অবৈধ চুল্লি নির্মাণ এবং চুনাপাথর মজুতের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিল। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তিতাসের পাইপলাইন থেকে বিনা মূল্যে ও অবৈধভাবে গ্যাস চুরি করে কারখানাটি দীর্ঘমেয়াদে সচল রাখা। ভবিষ্যতে যাতে কোনো অবস্থাতেই এই স্থানে আর এই অবৈধ কারখানাটি পুনরায় চালু করা না যায়, সেই সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে চুল্লিগুলো সম্পূর্ণ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ সময় কারখানা থেকে জব্দ করা বিপুল পরিমাণ চুনাপাথর এবং চুল্লি ভাঙার অবশিষ্টাংশ বা ইটগুলো স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সুনির্দিষ্ট জিম্মায় সুরক্ষিত রাখা হয়েছে এবং সরকারি প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তীতে সেগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তিনি আরও অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, এই চাঞ্চল্যকর অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত স্থানীয় প্রভাবশালী বেশ কয়েকজনের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে এসে পৌঁছেছে। যে জমির ওপর এই অবৈধ কারখানাটি গড়ে তোলা হয়েছিল, সেই জমির মালিক জেনেশুনেই অবৈধভাবে কারখানা স্থাপনের জন্য নিজের জমি ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। অথচ এই পুরো কার্যক্রমের পক্ষে সরকারের কোনো ধরনের বৈধ অনুমোদন, ছাড়পত্র বা ট্রেড লাইসেন্স ছিল না। ঘটনার সঙ্গে জড়িত মূল অপরাধীরা টের পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পালিয়ে যাওয়ায় তাদের হাতেনাতে ধরা সম্ভব না হলেও, তাদের বিরুদ্ধে কটিয়াদী থানায় নিয়মিত মামলা দায়েরের জন্য তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে সব ধরনের আইনি প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। অপরাধী যেই হোক না কেন, কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত