এলপিপির ক্রয়াদেশ অনিশ্চিত, চাপে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩০ বার

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প আবারও এক নতুন অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ফ্যাশন খুচরা বিক্রেতা পোল্যান্ডভিত্তিক এলপিপি (LPP SA) বাংলাদেশ থেকে নতুন ক্রয়াদেশ সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দেশের রপ্তানিমুখী পোশাক খাতে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান না হলে বছরে প্রায় ৭০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের রপ্তানি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে শত শত কারখানা, হাজারো শ্রমিক এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের ওপর।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির মধ্যেই বাংলাদেশের পোশাকশিল্প নানা চাপ মোকাবিলা করছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় কোনো আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান যদি ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেয় বা স্থগিত করে, তবে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং পুরো শিল্পখাতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সম্প্রতি এলপিপি এসএর ঢাকা কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা এবং তাদের বিরুদ্ধে পুলিশি হয়রানির অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এলপিপির দাবি, যেসব অর্থ পরিশোধ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে, সেই অর্থের প্রকৃত দায় তাদের নয়। তারপরও তাদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া এবং বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি হওয়ায় তারা বাংলাদেশে নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়া আপাতত স্থগিত রেখেছে।

জানা গেছে, গত ২১ জুলাই এলপিপি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বায়িং হাউস মালিকদের সংগঠন বিজিবিএকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয়। সেখানে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখ করে, কয়েক মাস ধরে কিছু বাংলাদেশি সরবরাহকারীর অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার দায় তাদের নয়। কিন্তু বাস্তবে তাদের কর্মকর্তাদের পুলিশি হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে তারা ধাপে ধাপে বাংলাদেশ থেকে সোর্সিং কার্যক্রম কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।

এরপর ৩১ জুলাই বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের কাছে পাঠানো আরেকটি চিঠিতে এলপিপি জানায়, পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক সমাধান না হওয়ায় নতুন ক্রয়াদেশ গ্রহণ এবং নতুন পণ্য উন্নয়নসংক্রান্ত কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, দুই সপ্তাহের মধ্যে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

ঘটনার পেছনে রয়েছে রাশিয়াভিত্তিক খুচরা বিক্রেতা এফইএস রিটেইলকে ঘিরে তৈরি হওয়া আর্থিক বিরোধ। কয়েকটি বাংলাদেশি বায়িং হাউস এবং পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করেছে, এফইএস রিটেইলের কাছে তাদের প্রায় ৪ কোটি মার্কিন ডলারের পাওনা বকেয়া রয়েছে। তাদের দাবি, এলপিপি এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল এবং অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তাও দিয়েছিল। তাই এই আর্থিক দায় থেকে এলপিপি সম্পূর্ণভাবে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রাখতে পারে না।

এই প্রেক্ষাপটে গত মাসে দুটি বায়িং হাউসের মালিক এলপিপির ঢাকা কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথক মামলা দায়ের করেন। মামলার পর কয়েকজন কর্মকর্তার বাসায় রাতে পুলিশি অভিযান চালানো হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এনসা ক্লথিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল কবির জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠান গত বছরের এপ্রিলে এফইএস রিটেইলের জন্য ৫২ হাজার মার্কিন ডলারের ট্রাউজার রপ্তানি করেছিল। পণ্য রাশিয়ায় পৌঁছানোর পরও অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা এবং বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওনা অর্থ উদ্ধার সম্ভব না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তারা আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

তবে এফইএস রিটেইলের কাছে বকেয়া থাকা আরও কয়েকজন সরবরাহকারী ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, ক্রয়াদেশ দিয়েছে এফইএস রিটেইল এবং অর্থ পরিশোধের দায়ও তাদেরই। এলপিপি কেবল ব্যবসায়িক সংযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। ফলে আইনগতভাবে পুরো দায় এলপিপির ওপর বর্তায় না।

এদিকে বিজিএমইএর পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংগঠনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। আইনগতভাবে এলপিপির সরাসরি দায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে তিনি জানান, এলপিপির কর্মকর্তাদের যেন অপ্রয়োজনীয় হয়রানির শিকার হতে না হয়, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়েও যোগাযোগ করা হয়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলপিপি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বড় পোশাক ক্রেতা। বিশ্বের ৪৬টি দেশে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৩ হাজার ৭০০ বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। বাংলাদেশের অন্তত ৪৩টি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ২৫০টি কারখানা এলপিপির জন্য পোশাক উৎপাদন করে। বছরে প্রায় ৭০ কোটি ডলারের পোশাক বাংলাদেশ থেকে সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি। চলতি অর্থবছরে সেই পরিমাণ ৭৭ কোটি ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনাও ছিল।

এই বিপুল পরিমাণ ক্রয়াদেশ স্থগিত হলে তার প্রভাব শুধু বড় কারখানাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ছোট ও মাঝারি আকারের অসংখ্য কারখানা উৎপাদন সংকটে পড়তে পারে। শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, কাঁচামাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট পরিবহন ও লজিস্টিক খাতও এর নেতিবাচক প্রভাব অনুভব করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। যুদ্ধের কারণে ২০২২ সালে এলপিপি তাদের রাশিয়ার ব্যবসা বিক্রি করে দেয়। পরে কেসিএস এবং পরবর্তীতে এফইএস রিটেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ার বাজারে পোশাক সরবরাহ শুরু হয়। শুরুতে অর্থ পরিশোধ স্বাভাবিক থাকলেও গত বছর থেকে অনিয়ম দেখা দেয়, যা এখন বড় ধরনের বিরোধে রূপ নিয়েছে।

বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক মনে করেন, এই সংকটের সমাধান আদালতের বাইরে আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। তাঁর মতে, ক্ষতিগ্রস্ত রপ্তানিকারকদের স্বার্থ রক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি দেশের অন্যতম বড় আন্তর্জাতিক ক্রেতাকে হারানোও কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ধরনের সংকট দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এলপিপির বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আন্না স্তাশকিয়েভিচ এক ই-মেইল বার্তায় জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়কে জানানো হয়েছে এবং খুব শিগগিরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থান প্রকাশ করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট শুধু একটি ব্যবসায়িক বিরোধ নয়; এটি বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে আইনি স্বচ্ছতা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির সক্ষমতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত রপ্তানিকারকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করে এমন একটি সমাধান বের করতে হবে, যাতে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত নতুন কোনো অস্থিরতার মুখে না পড়ে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত