বেসরকারি ঋণে রেকর্ড পতন, বিনিয়োগ ফেরাতে নতুন উদ্যোগ

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার

প্রকাশ: ৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা আরও প্রকট হয়েছে। বিনিয়োগে অনীহা, শিল্পকারখানায় ধীরগতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ সুদহার ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। চলতি বছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে সর্বনিম্ন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য।

অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত বেসরকারি খাতে ঋণের এই নিম্নগতি নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। তাঁদের মতে, শুধু সুদের হার কমানো নয়, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা, জ্বালানি সংকট সমাধান এবং ব্যবসায়িক আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

গত কয়েক বছর ধরে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে যে ধীরগতি চলছে, তার প্রভাব সরাসরি পড়েছে ব্যাংকঋণে। উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্প হাতে নিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন, অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বা কার্যক্রম সীমিত করেছে। ফলে ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ বিতরণে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল ১৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে চলতি বছরের জুন শেষে ঋণস্থিতি বেড়ে দাঁড়ালেও প্রবৃদ্ধির হার কমে গেছে।

গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে আসে। মে মাসে এই হার ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং এপ্রিল মাসে ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর আগে করোনা মহামারির মতো কঠিন সময়েও বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশের নিচে নামেনি।

ব্যাংকারদের মতে, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। কিছু ব্যাংক তারল্য সংকট ও ঋণ ব্যবস্থাপনার সমস্যার কারণে নতুন ঋণ বিতরণ প্রায় সীমিত করেছে। পাশাপাশি নতুন শিল্প ও ব্যবসায়িক উদ্যোগের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ঋণের চাহিদাও কমেছে।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, অনেক ব্যাংক সমস্যায় পড়ায় ঋণ কার্যক্রম সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগের গতি কম থাকায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ছে না। উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বাড়ানো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনতে সম্প্রতি নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘ ২১ মাস কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পর রেপো রেট ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহের খরচ কিছুটা কমবে এবং ধীরে ধীরে ব্যাংকঋণের সুদহারও কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ এবং বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করেই নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, শুধু সুদের হার কমালেই বিনিয়োগের পরিবেশ পুরোপুরি ফিরে আসবে না। তাঁদের মতে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি, প্রশাসনিক জটিলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নীতির ধারাবাহিকতার অভাব এখনো বড় বাধা হয়ে আছে।

দেশের ব্যবসায়ী মহলের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটাতে সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন খাতের জন্য প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এই অর্থ দ্রুত ও সঠিকভাবে বিতরণ করা গেলে শিল্প ও ব্যবসা খাতে কিছুটা গতি ফিরতে পারে।

এ ছাড়া দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের ঋণসীমা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তও ব্যাংকঋণ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে ব্যাংকটি গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বেশি ঋণ বিতরণের সুযোগ পাবে।

অর্থনীতিবিদরা অবশ্য সতর্ক করে বলছেন, সুদের হার কমানোর ফলে ঋণের প্রবাহ বাড়লেও উৎপাদনশীল খাতে অর্থ না গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। অতীতে কিছু ঋণ প্রকৃত বিনিয়োগের পরিবর্তে অন্য কাজে ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। তাই ঋণের মান ও ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

এ কে খান গ্রুপের পরিচালক ও ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক দীর্ঘদিন ধরে চাপে রয়েছে। নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নীতিগত সংস্কার ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর মতে, ঘোষিত প্রণোদনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি, তাই সমাধানেও সময় লাগবে। অর্থনীতির সূচকগুলো ইতিবাচক অবস্থায় ফিরতে এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় প্রয়োজন হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়া শুধু ব্যাংকিং খাতের সমস্যা নয়, এটি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কারণ নতুন ব্যবসা, শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান তৈরির বড় অংশই নির্ভর করে এই খাতের ওপর।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদহার কমানোর উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কত দ্রুত ফিরে আসে তার ওপর। অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ব্যাংকঋণের পাশাপাশি প্রয়োজন স্থিতিশীল নীতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ব্যবসার জন্য নিরাপদ ও সহজ পরিবেশ নিশ্চিত করা।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত