বাংলা কিউআরেই নগদহীন অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৭ বার

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক খাত গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং অনলাইন পেমেন্ট সেবার বিস্তারের ফলে নগদ টাকার বিকল্প ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এই ধারাবাহিকতায় দেশের পেমেন্ট ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে বাংলা কিউআর (Bangla QR)। ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং অন্যান্য ডিজিটাল পেমেন্ট সেবাদাতাকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার মাধ্যমে বাংলা কিউআর দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় আন্তঃসংযোগ (ইন্টারঅপারেবিলিটি) নিশ্চিত করার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সম্প্রতি রাজধানীর একটি রেস্তোরাঁয় খাবারের বিল পরিশোধ করতে গিয়ে একজন গ্রাহক এমন একটি বাংলা কিউআর কোড স্ক্যান করেন, যা একটি ব্যাংকের নামে নিবন্ধিত। কিন্তু তিনি অর্থ পরিশোধ করেন অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে। কয়েক মাস আগেও এমন লেনদেন বাস্তবে সম্ভব ছিল না। বর্তমানে একই কিউআর কোড ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএস অ্যাপ থেকে অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হওয়ায় গ্রাহকদের জন্য ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলা কিউআর কেবল একটি নতুন প্রযুক্তি নয়; এটি দেশের ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামোর একটি মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা। কারণ, এটি এমন একটি উন্মুক্ত নেটওয়ার্ক যেখানে প্রতিযোগী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও একই অবকাঠামো ব্যবহার করে গ্রাহককে সেবা দিতে পারে। ফলে গ্রাহক নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজের সুবিধামতো অ্যাপ ব্যবহার করতে পারছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সফলতার অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য এসেছে উন্মুক্ত ও আন্তঃসংযুক্ত অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে। ভারতের ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই), সিঙ্গাপুরের এসজিকিউআর এবং কেনিয়ার এম-পেসা এ ধরনের সফল উদাহরণ। এসব ব্যবস্থার মূল শক্তি ছিল প্রযুক্তির পাশাপাশি ব্যবহারকারীর সহজ প্রবেশাধিকার, নির্ভরযোগ্যতা এবং আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলা কিউআরও বাংলাদেশে একই ধরনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে লেনদেনকে আরও স্বচ্ছ, নিরাপদ এবং দ্রুত করা সম্ভব। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে ব্যাংক ঋণ কিংবা অন্যান্য আর্থিক সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ডিজিটাল আর্থিক সেবা ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দ্রুত বিস্তার, কোভিড-১৯ মহামারির সময় ডিজিটাল মাধ্যমে সরকারি সহায়তা বিতরণ এবং অনলাইন আর্থিক সেবার সম্প্রসারণ প্রমাণ করেছে যে, উপযুক্ত নীতি ও প্রযুক্তিগত সুবিধা থাকলে দেশের মানুষ নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে আগ্রহী।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল একটি আধুনিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম তৈরি করলেই নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। বাস্তব চিত্র হলো, দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী এখনো নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল। কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী কিংবা বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা প্রতিদিন নগদ অর্থে আয় করেন এবং একইভাবে ব্যয়ও করেন।

এই পরিস্থিতিতে বাংলা কিউআরের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়নের অন্যতম শর্ত হচ্ছে সহজ ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট ব্যবস্থা। অর্থাৎ মানুষ যেন খুব সহজেই নগদ অর্থ ব্যাংক হিসাব বা ডিজিটাল ওয়ালেটে জমা দিতে এবং প্রয়োজন হলে আবার তুলে নিতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, কিউআর কোড নতুন অর্থ তৈরি করে না; এটি কেবল বিদ্যমান ডিজিটাল অর্থ স্থানান্তরের একটি মাধ্যম।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো কৃষক যদি স্থানীয় হাটে সবজি বিক্রি করে নগদ অর্থ পান এবং সেই অর্থ সহজেই নিকটস্থ কোনো ব্যাংকিং অ্যাক্সেস পয়েন্টে জমা দিতে পারেন, তাহলে পরে তিনি সার, বীজ কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য বাংলা কিউআর ব্যবহার করে কিনতে পারবেন। কিন্তু যদি অর্থ জমা দিতে অনেক দূরে ব্যাংক শাখায় যেতে হয়, তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই নগদ অর্থ নিজের কাছেই রাখবেন।

এ কারণে বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কেবল পেমেন্ট অ্যাপ নয়; বরং ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট নেটওয়ার্ক। কেনিয়ার এম-পেসা কিংবা বাংলাদেশের বিকাশ ও নগদের বিস্তৃত এজেন্ট নেটওয়ার্কের সফলতার অন্যতম কারণও ছিল সহজে টাকা জমা ও উত্তোলনের সুবিধা।

বাংলাদেশ ব্যাংক যদি ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আওতায় অনুমোদিত এজেন্ট, মার্চেন্ট কিংবা অন্যান্য সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট সুবিধা আরও বিস্তৃত করতে পারে, তাহলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এতে বাংলা কিউআরের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

এদিকে ব্যবসায়ীদের জন্যও ডিজিটাল পেমেন্টকে আরও আকর্ষণীয় করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর), দ্রুত অর্থ নিষ্পত্তি (সেটেলমেন্ট), নির্ভরযোগ্য গ্রাহকসেবা এবং কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে অনেক ব্যবসায়ী এখনো নগদ লেনদেনকেই বেশি নিরাপদ মনে করবেন।

একই সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। নতুন মার্চেন্ট যুক্ত করা, কিউআর সরবরাহ, গ্রাহক পরিচয় যাচাই (ই-কেওয়াইসি), সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলা কিউআরকে কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্যোগ হিসেবে না দেখে জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এতে ব্যাংক, এমএফএস, ফিনটেক প্রতিষ্ঠান এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও সমন্বিত নীতি গ্রহণ সহজ হবে। একই সঙ্গে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাক্সেস পয়েন্ট সম্প্রসারণের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিও বাড়ানো সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন একটি বড় সুযোগ রয়েছে। যদি প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের সহজ প্রবেশাধিকার, আর্থিক প্রণোদনা এবং ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি আস্থা গড়ে তোলা যায়, তাহলে বাংলা কিউআর শুধু একটি পেমেন্ট মাধ্যম হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এর মাধ্যমে নগদনির্ভরতা কমবে, আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়বে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আরও বেশি আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবেন এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হবে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত