প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দুটি মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা হলো ‘জাতীয় রপ্তানি পদক’ এবং ‘বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (সিআইপি-রপ্তানি)’। প্রতি বছর দেশের রপ্তানি খাতে অসামান্য অবদান রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় রপ্তানি ট্রফি (পদক) এবং ২০২৭ সালের জন্য সিআইপি (রপ্তানি) নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এ উপলক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) অনলাইনে আবেদন আহ্বান করেছে।
ইপিবির ঘোষণায় বলা হয়েছে, গত ১ আগস্ট থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে এবং আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত আবেদন করা যাবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনলাইনে আবেদন জমা দিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে হবে। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করবে। পরে আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নির্বাচিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে জাতীয় রপ্তানি পদক এবং সিআইপি সম্মাননা তুলে দেওয়া হবে।
ব্যবসায়িক মহলে জাতীয় রপ্তানি পদক শুধু একটি পুরস্কার নয়; এটি দেশের রপ্তানি সক্ষমতা, শিল্পোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। একইভাবে সিআইপি মর্যাদা একজন রপ্তানিকারকের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য, ব্যবসায়িক নেতৃত্ব এবং অর্থনীতিতে অবদানের স্বীকৃতি বহন করে। ফলে প্রতি বছর দেশের শীর্ষ রপ্তানিকারকদের মধ্যে এই স্বীকৃতি অর্জনের জন্য ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়।
এবার জাতীয় রপ্তানি পদক দেওয়া হবে মোট ২৯টি পণ্য ও সেবা খাতে। তবে প্রতিটি খাতের জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম রপ্তানি আয় অর্জন করা বাধ্যতামূলক। তৈরি পোশাক খাতে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয়ের শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। ওভেন ও নিট পোশাক খাতে আবেদন করতে হলে কমপক্ষে ৭ কোটি মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় থাকতে হবে। হোম ও স্পেশালাইজড টেক্সটাইলের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। সুতা, ম্যানমেড ফাইবার, ডেনিম, কেমিক্যালস, কাগজ, টেক্সটাইল ফেব্রিকস, হিমায়িত খাদ্য, পাটজাত পণ্য, চামড়া, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য, গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, সিরামিক, আসবাব, প্লাস্টিক, কৃষিপণ্য, কম্পিউটার সেবা, হস্তশিল্প এবং নারী উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন খাতের জন্যও পৃথকভাবে ন্যূনতম রপ্তানি আয়ের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সবচেয়ে কম আয়সীমা রাখা হয়েছে হস্তশিল্পজাত পণ্যের ক্ষেত্রে, যেখানে কমপক্ষে ৫ লাখ মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় থাকলেই আবেদন করা যাবে। অন্যদিকে কৃষিপণ্য, নারী উদ্যোক্তা, অপ্রচলিত পণ্যসহ কয়েকটি খাতে ১০ লাখ ডলার রপ্তানি আয়কে যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ২০২৭ সালের সিআইপি (রপ্তানি) নির্বাচনের জন্যও আবেদন আহ্বান করেছে ইপিবি। এবার মোট ৩৫টি পণ্য ও সেবা খাতে আবেদন করা যাবে। এখানেও তৈরি পোশাক খাতেই সর্বোচ্চ ৭ কোটি মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের শর্ত রাখা হয়েছে। এরপর হোম টেক্সটাইল, সুতা, ম্যানমেড ফাইবার, ডেনিম, জাহাজ নির্মাণ, টেক্সটাইল ফেব্রিকস, হিমায়িত খাদ্য, চামড়া, জীবিত ও বরফায়িত মাছ, ইলেকট্রনিকস, ওষুধ, ট্যুরিজম, ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার, কৃষিপণ্য, জুয়েলারি, প্লাস্টিক, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে আলাদা আয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইপিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিআইপি এবং জাতীয় রপ্তানি পদকের ক্ষেত্রে শুধু রপ্তানি আয় নয়, ব্যবসার স্বচ্ছতা, আইন মেনে পরিচালনা এবং আর্থিক শৃঙ্খলাও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। ফলে আবেদনকারীদের কর পরিশোধ, ভ্যাট প্রদান, পরিবেশগত ছাড়পত্র, ব্যাংকের রপ্তানি অর্থ দেশে ফেরত আনার সনদ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে।
জাতীয় রপ্তানি পদকের জন্য আবেদনকারীদের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আয়কর পরিশোধের প্রত্যয়নপত্র, ব্যাংক প্রদত্ত প্রসিডস রিয়েলাইজেশন সার্টিফিকেট (পিআরসি), প্রয়োজনে ই-পিআরসি, পরিবেশ অধিদপ্তরের হালনাগাদ সনদ, ঋণখেলাপি নন—এ মর্মে ঘোষণাপত্র এবং কারখানার কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত নথি জমা দিতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান একাধিক পণ্য বা সেবা রপ্তানি করলে প্রতিটি খাতের জন্য পৃথক আবেদন করতে হবে। এক খাতের রপ্তানি আয় অন্য খাতের সঙ্গে যোগ করে আবেদন করলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে।
সিআইপি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরনের কাগজপত্র জমা দিতে হবে। তবে এর সঙ্গে ভ্যাট পরিশোধের সনদ, অর্থ পাচারসংক্রান্ত মামলায় জড়িত নন—এ মর্মে ঘোষণাপত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথিও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই মালিকানাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠান যদি একই পণ্য বা সেবা রপ্তানি করে থাকে, তাহলে পুরো গ্রুপের পক্ষে কেবল একজন উদ্যোক্তা আবেদন করতে পারবেন।
আবেদন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন এক্সপোর্ট মনিটরিং সিস্টেম (ওইএমএস)-এর তথ্যকে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আবেদনকারীদের জমা দেওয়া পিআরসি ওইএমএসে সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। কোনো ধরনের তথ্য গরমিল বা অসম্পূর্ণতা থাকলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
রপ্তানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জাতীয় রপ্তানি পদক এবং সিআইপি স্বীকৃতি শুধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্মান নয়; এটি দেশের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তাদেরও রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগে উৎসাহিত করে এই স্বীকৃতি।
বাংলাদেশ বর্তমানে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, আইসিটি, কৃষিপণ্য, চামড়াজাত পণ্য, হস্তশিল্প, সিরামিক এবং প্রকৌশল পণ্যসহ বহুমুখী রপ্তানি খাত সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে জাতীয় রপ্তানি পদক এবং সিআইপি নির্বাচন করা হলে দেশের রপ্তানি খাত আরও গতিশীল হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।