প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতার আওতা আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন করে ৮৬ হাজার ৭০৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত হলে দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত আরও দুই লাখ ৫৬ হাজার ৭৪ জন ধর্মীয় নেতা ও সংশ্লিষ্ট কর্মী সরকারি সম্মানী ভাতার সুবিধা পাবেন।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সোমবার (১০ আগস্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ৮২ হাজার ৬৫৬টি মসজিদ, তিন হাজার মন্দির, ৭৫২টি বৌদ্ধ বিহার এবং ৩০১টি গির্জা। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন।
সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য মাসিক সম্মানী এবং প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালুর যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় এই সম্প্রসারণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে গঠিত একটি সেলের সভায় নতুন প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের প্রশিক্ষণ ও কল্যাণমূলক কার্যক্রমের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
নতুন কর্মসূচিতে মসজিদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে অঞ্চলভেদে নির্দিষ্ট মানদণ্ড রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে ১৫টি করে মসজিদ নির্বাচনের কথা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। পৌরসভাগুলোর ক্ষেত্রে শ্রেণিভেদে মসজিদ নির্বাচনের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। ‘ক’ শ্রেণির পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে চারটি, ‘খ’ শ্রেণির পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে তিনটি এবং ‘গ’ শ্রেণির পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে দুটি মসজিদ এই সুবিধার জন্য নির্বাচন করা হবে।
সিটি করপোরেশন এলাকার ক্ষেত্রেও আলাদা নীতিমালা রাখা হয়েছে। সেখানে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ছয়টি করে মসজিদ নির্বাচন করা হবে। ফলে দেশের গ্রামাঞ্চলের পাশাপাশি শহরাঞ্চলের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও এ কর্মসূচির আওতায় আসার সুযোগ পাবে।
মন্দির নির্বাচনের ক্ষেত্রেও উপজেলা ও পৌরসভাভিত্তিক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রতিটি উপজেলা থেকে পাঁচটি মন্দির নির্বাচন করা হবে। এর মধ্যে ‘ক’ শ্রেণির পৌরসভার প্রতিটি থেকে দুটি এবং অন্যান্য শ্রেণির পৌরসভার প্রতিটি থেকে একটি মন্দির নির্বাচন করা হবে। বাকি মন্দিরগুলো ইউনিয়ন পর্যায় থেকে নির্বাচন করার কথা জানিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়।
বৌদ্ধ বিহার ও গির্জার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের সংখ্যা জেলা ভিত্তিকভাবে নির্ধারণ করা হবে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা জেলাভিত্তিক ২৫ শতাংশ হারে নির্ধারণ করা হবে। ফলে ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উপাসনালয়কে কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্মানীর আওতায় নির্বাচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারীদের জন্য নির্দিষ্ট হারে মাসিক অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। নির্বাচিত মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ এবং গির্জার যাজক প্রত্যেকে মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে সম্মানী পাবেন।
অন্যদিকে মসজিদের মুয়াজ্জিন, মন্দিরের সেবাইত, বৌদ্ধ বিহারের উপাধ্যক্ষ এবং গির্জার সহকারী যাজকের মাসিক সম্মানীর পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে তিন হাজার টাকা। মসজিদের খাদেমরা পাবেন মাসে দুই হাজার টাকা করে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সম্মানীর অর্থ সরাসরি উপকারভোগীদের ব্যাংক হিসাবে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার বা ইএফটির মাধ্যমে পাঠানো হবে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমানোর পাশাপাশি অর্থ বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের মাসিক সম্মানী দেওয়ার জন্য চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এক হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে দেশের মোট ধর্মীয় উপাসনালয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই সুবিধার আওতায় আসবে। এরপর পরবর্তী তিন অর্থবছরে ধাপে ধাপে দেশের শতভাগ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল আগের অর্থবছরেই। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে একটি পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। সেই প্রকল্পের আওতায় দেশের ছয় হাজার ১৭টি নির্বাচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট ১৩ হাজার ৯৪৯ জনকে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় সম্মানী দেওয়া হয়। এর মধ্যে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত, সেবাইতসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিরা ছিলেন।
পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এবার কর্মসূচির পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়ানো হচ্ছে বলে মন্ত্রণালয়ের তথ্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়। কয়েক হাজার প্রতিষ্ঠানের সীমিত পরিসর থেকে এক লাফে ৮৬ হাজারের বেশি নতুন প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে রাষ্ট্রীয় এই কর্মসূচি এখন অনেক বড় আকার নিতে যাচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে তাদের জীবনযাত্রায় কিছুটা স্থিতিশীলতা আসতে পারে। বিশেষ করে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম, মন্দিরের পুরোহিত ও সেবাইত, বৌদ্ধ বিহারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং গির্জার যাজকদের মতো ধর্মীয় সেবায় যুক্ত ব্যক্তিরা নিয়মিতভাবে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে কাজ করেন। তাদের আর্থিক ও পেশাগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি ধর্মীয় ও সামাজিক পরিসরেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে কর্মসূচির পরিধি যত বাড়বে, বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জও তত বাড়বে। সঠিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, উপকারভোগীর তথ্য যাচাই, ব্যাংক হিসাবের সঠিকতা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিতভাবে সম্মানীর অর্থ পৌঁছে দেওয়া—এসব ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে নজরদারি ও জবাবদিহির ব্যবস্থাও কার্যকর রাখার প্রয়োজন হবে।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী তিন অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে দেশের সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এই সুবিধার আওতায় আসবে। ফলে বর্তমানে সীমিত পরিসরে চালু থাকা রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতা ভবিষ্যতে দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক একটি বড় সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচিতে রূপ নিতে পারে।
নতুন করে ৮৬ হাজার ৭০৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত তাই শুধু ভাতার পরিধি বাড়ানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে দেশের বিপুলসংখ্যক ধর্মীয় সেবাদানকারীর আর্থিক সহায়তা, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক সম্পৃক্ততার একটি নতুন অধ্যায়।