প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব কূটনীতির সর্বোচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চ জাতিসংঘে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ আট দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলার মতো গুরুদায়িত্ব পালনকারী এই বিশ্ব সংস্থার শীর্ষ পদে এবার এক নারী নেতৃত্ব আসার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কোস্টারিকার বিশিষ্ট কূটনীতিক, খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ এবং জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা ইউএনসিটিএডির বর্তমান প্রধান রেবেকা গ্রিনস্প্যান জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব পদে আসীন হওয়ার দীর্ঘ লড়াইয়ে অন্য সব প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে বর্তমানে সবার চেয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে রয়েছেন। জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক গোপনীয় ভোটাভুটির ফলাফলে তার পক্ষে যে অভূতপূর্ব সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা প্রকাশ পেয়েছে, তাতে কৌতূহলী বিশ্ববাসীর নজর এখন কোস্টারিকার এই প্রথিতযশা কূটনীতিবিদের দিকেই নিবদ্ধ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি যদি এই গৌরবোজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক আসনে অভিষিক্ত হতে পারেন, তবে তা হবে বিশ্ব সংস্থার দীর্ঘ বর্ণাঢ্য ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক, কারণ তিনি হবেন জাতিসংঘের প্রথম নারী মহাসচিব। শুধু নারী হিসেবেই নয়, বরং নির্বাচিত হলে তিনি বিশ্ব সংস্থার ইতিহাসে প্রথম ইহুদি মহাসচিব হিসেবেও এক নতুন ও অভূতপূর্ব বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টি করবেন।
রেবেকা গ্রিনস্প্যানের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জীবনের পটভূমি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও সংগ্রামের এক বাস্তব দলিল। তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইতিহাস মানব ইতিহাসের বহু গৌরব ও বেদনার সাক্ষী হয়ে আছে। কোস্টারিকার সাবেক এই ভাইস প্রেসিডেন্টের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এমন এক পরিবারে, যাদের শিকড় জড়িয়ে রয়েছে ইউরোপের গভীর ট্র্যাজেডির সঙ্গে। তার বাবা-মা একসময় ইউরোপের পোল্যান্ড দেশ ছেড়ে সুদূর কোস্টারিকায় গিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করেছিলেন এবং অভিবাসী হিসেবে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সংঘটিত নাৎসি জার্মানির ইহুদি নিধনযজ্ঞ বা হলোকাস্টের নির্মম শিকার হয়েছিলেন রেবেকা গ্রিনস্প্যানের নানা-নানি। নাৎসিদের বুলেটে ও বন্দিশালার অকথ্য নির্যাতনে তার পূর্বপুরুষরা প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই নাৎসি বর্বরতা ও নির্মমতার বিরুদ্ধে বেঁচে ফেরা পরিবারের রক্তের উত্তরাধিকারী হিসেবে রেবেকা গ্রিনস্প্যান পরবর্তীতে বিশ্বমঞ্চে একজন প্রগতিশীল, মানবিক ও দৃঢ়চেতা কূটনীতিবিদ হিসেবে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন। ব্যক্তিগত জীবনের নানা চড়াই-উতরাই ও পারিবারিক সেই ঐতিহাসিক বেদনার ছায়া পেরিয়ে তিনি আজ বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম শীর্ষ ক্ষমতাধর আসনে বসার এক সুবর্ণ সুযোগের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছেন।

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে অত্যন্ত গোপনীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ এক ভোটাভুটি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য দেশ এবং অস্থায়ী দশ সদস্য দেশের সমন্বয়ে মোট পনেরোটি সদস্য রাষ্ট্র এই গুরুত্বপূর্ণ ভোটাভুটিতে অংশগ্রহণ করে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদের এই গোপন ভোটে রেবেকা গ্রিনস্প্যানের পক্ষে সরাসরি ১০টি দেশ জোরালো সমর্থন জানিয়েছে। তার এই বিপুল জনপ্রিয়তার বিপরীতে চারজন সদস্য দেশ কোনো মতামত বা ভোটাভুটিতে পক্ষাবলম্বন থেকে বিরত থাকে এবং মাত্র একজন সদস্য দেশ তার প্রার্থিতার বিরুদ্ধে আপত্তি বা নেতিবাচক ভোট প্রদান করে। রেবেকা গ্রিনস্প্যানের এই শক্ত অবস্থানের ঠিক পরেই রয়েছে তার অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গায়ানার সাবেক জাতিসংঘ দূত ক্যারোলিন রড্রিগেস-বার্কেটের নাম, যিনি মোট ৯টি সমর্থন এবং দুটি আপত্তির ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন। নিরাপত্তা পরিষদের এই প্রাথমিক ভোটাভুটির ফলাফল থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বড় একটি অংশ বিশ্ব সংস্থার নেতৃত্বে আমূল পরিবর্তন আনার পক্ষে এবং একজন যোগ্য নারী নেতাকে এই বৈশ্বিক দায়িত্ব অর্পণ করার বিষয়ে তারা যথেষ্ট ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন।
বর্তমান জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বর্তমান ও শেষ মেয়াদের মেয়াদকাল আগামী ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হতে চলেছে। তার বিদায়ের ক্ষণ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বজুড়ে নতুন মহাসচিব কে হবেন, তা নিয়ে কূটনৈতিক পাড়ায় নানা হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের প্রচলিত ও দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক আঞ্চলিক পালাক্রমের নিয়মানুযায়ী, এই দফায় লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে নতুন মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা ও নৈতিক দাবি রয়েছে। সেই সুবাদেই লাতিন আমেরিকার অত্যন্ত পরিচিত ও সফল মুখ রেবেকা গ্রিনস্প্যান এই দৌড়ে শুরু থেকেই শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। বিশেষ করে, জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা ইউএনসিটিএডির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিশ্ব অর্থনীতি ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার আদায়ের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো ভূমিকা পালন করেছেন। ফিলিস্তিনি অর্থনীতির ওপর ইসরায়েলি সামরিক দখলদারিত্ব ও অব্যাহত আগ্রাসনের কারণে যে বিশাল মাপের আর্থিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তার নির্ভুল ও প্রামাণ্য তথ্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে তিনি ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন। ইউএনসিটিএডির প্রকাশিত ২০২৬ সালের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে, ২০০০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ চব্বিশ বছরে ফিলিস্তিনি অর্থনীতিকে আনুমানিক প্রায় ২১২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ হারাতে হয়েছে, যা ইসরায়েলি দখলদারিত্বের নির্মম বাস্তবতাকে বিশ্বমঞ্চে উন্মোচন করেছে।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের এই শীর্ষ পদের দৌড়ে রেবেকা গ্রিনস্প্যানের পাশাপাশি অন্য বেশ কয়েকজন নামজাদা আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বেরও নাম আলোচিত হচ্ছিল। উদাহরণস্বরূপ, চিলির অত্যন্ত জনপ্রিয় সাবেক রাষ্ট্রপতি মিশেল বাশেলেটসহ আরও বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট প্রার্থী এই পদের জন্য লড়ছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতির মারপ্যাঁচ এবং প্রভাবশালী কিছু পরাশক্তি দেশের কঠোর বিরোধিতার মুখে তাদের অনেকের যাত্রাপথেই বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়েছে। জাতিসংঘের নিয়মানুযায়ী, নতুন মহাসচিব নির্বাচিত হতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের মোট পনেরোটি সদস্য দেশের মধ্যে অন্তত নয়টি দেশের ইতিবাচক বা অনুকূল ভোটের প্রয়োজন হয়। এর পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষমতাধর পাঁচ স্থায়ী সদস্য দেশের কোনো একটি দেশও যদি তাদের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তবে সেই প্রার্থীর সমস্ত সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। ফলে স্থায়ী পাঁচ সদস্য দেশের সম্মতি আদায় করা এবং তাদের কোনো ধরনের ভেটোর মুখে না পড়ে সব বাধা পেরিয়ে আসা যেকোনো প্রার্থীর জন্যই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এই জটিল কূটনৈতিক সমীকরণ ও চুলচেরা বিশ্লেষণে বর্তমানে বাকি প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে রেবেকা গ্রিনস্প্যানই সবচেয়ে সুবিধাজনক ও গ্রহণযোগ্য অবস্থানে রয়েছেন বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব সংস্থার এই মেগা নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য সময়ের ঘড়ি দ্রুত টিকটিক করে এগিয়ে চলেছে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, বর্তমানের এই উত্তাল ও পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নতুন মহাসচিবকে অবশ্যই ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করতে হবে। কূটনৈতিক মহলের ধারণা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াটি আগামী অক্টোবরের মধ্যে চূড়ান্ত রূপ লাভ করতে পারে এবং তখনই নিশ্চিত হয়ে যাবে বিশ্ব কূটনীতির এই সর্বোচ্চ মসনদে কে বসতে চলেছেন। বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের প্রভাবশালী গণমাধ্যমে এই খবর ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে যখন নানা যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে মানবসভ্যতা এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে, তখন জাতিসংঘের মতো বিশ্ব সংস্থার হাল ধরতে একজন নারী ও মানবিক চেতনার মানুষের আগমন বিশ্ববাসীর মনে নতুন করে আশার আলো সঞ্চার করছে। কোস্টারিকার সাধারণ এক অভিবাসী পরিবারের সন্তান থেকে শুরু করে বিশ্ব কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে যাওয়া রেবেকা গ্রিনস্প্যানের এই জীবনসংগ্রাম এবং জাতিসংঘের প্রথম নারী মহাসচিব হওয়ার ইতিহাস গড়ার এই পুরো প্রক্রিয়াটি এখন বিশ্বজুড়ে এক অন্যতম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।