ফিলিস্তিনিদের ৫৫০ একর জমি দখল করল ইসরাইল

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৯ বার

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের সালফিত প্রদেশের মারদা শহরে প্রায় ৫৫০ একর ফিলিস্তিনি জমি দখলের জন্য নতুন সামরিক আদেশ জারি করেছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। সামরিক কাজে ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে জারি করা এই আদেশে ২ হাজার ২২৪ দুনাম বা প্রায় ৫৫০ একর জমি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফিলিস্তিনের বসতি স্থাপন ও প্রাচীর-প্রতিরোধ বিষয়ক কমিশন সোমবার এ তথ্য জানিয়েছে।

কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ নতুন একটি সামরিক আদেশের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলীয় মারদা শহরের ওই বিস্তীর্ণ জমি দখলের নির্দেশ দিয়েছে। আদেশের আওতায় ওয়াদি কাসেম ও কাফিফ আল-আবহার এলাকার জমিও রয়েছে। আদেশে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জমির দখল ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তার মাধ্যমে ইসরাইলি সামরিক কমান্ডারের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

ফিলিস্তিনি কমিশন বলছে, সামরিক আদেশের সঙ্গে সংযুক্ত মানচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, লক্ষ্য করা জমিগুলো ৫০৫ নম্বর সড়কের ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত। স্থানীয় একটি সড়কের সঙ্গে ৫০৫ নম্বর সড়কের সংযোগস্থলের কাছাকাছি এই ভূখণ্ডের অবস্থান। একই সঙ্গে এলাকাটি ইসরাইলি বসতি হিসেবে পরিচিত আরিয়েলের উত্তরের অংশের দিকে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের কাছাকাছি এবং মারদা ও জামাইনের মাঝামাঝি এলাকায় পড়েছে।

কমিশনের দাবি, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জমিগুলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, এই ভূখণ্ড থেকে ওই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সামরিক আদেশে জমি দখলের ঘোষিত উদ্দেশ্য হিসেবে একটি টাওয়ার বা যোগাযোগ স্থাপনা নির্মাণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, সামরিক প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে জমি দখলের এমন আদেশ পশ্চিম তীরে ক্রমেই বাড়ছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের পদক্ষেপ শুধু সামরিক অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর মাধ্যমে বিভিন্ন সড়ক, যোগাযোগপথ ও ইসরাইলি বসতির আশপাশের এলাকায় নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের সামরিক আদেশ জারি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ফিলিস্তিনের বসতি স্থাপন ও প্রাচীর-প্রতিরোধ বিষয়ক কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ সামরিক প্রয়োজনের অজুহাতে ফিলিস্তিনি জমি দখলের ৪০টি সামরিক আদেশ জারি করে। এসব আদেশে মোট ৬১১ দুনাম জমি লক্ষ্য করা হয়। একই সময়ে চারটি বাফার জোন, ১৬টি নিরাপত্তা সড়ক এবং ১২টি সামরিক স্থাপনা গড়ে তোলার কথাও কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু সামরিক আদেশের মাধ্যমেই নয়, পশ্চিম তীরে ভূমি নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। চলতি বছরের মার্চেও সালফিত ও জেনিন প্রদেশে ফিলিস্তিনিদের মালিকানাধীন ১৩৩ দুনাম জমি সামরিক প্রয়োজনের কথা বলে দখলের অভিযোগ উঠেছিল। ওই সময় সালফিতের দেইর ইস্তিয়া এলাকায় মারদার দক্ষিণে একটি নিরাপত্তা সড়ক নির্মাণের জন্য জমি নেওয়ার আদেশও জারি করা হয়েছিল।

মারদা এলাকাতেও সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইলি বাহিনীর বিভিন্ন তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছিল, মারদা ও পার্শ্ববর্তী জামাইনের কাছে কয়েকটি স্থানীয় ও কাঁচা সড়ক মাটি ও পাথর দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। একই এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে সড়কসংলগ্ন এলাকায় কাজ করার কথাও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানানো হয়।

নতুন ভূমি দখলের আদেশকে তাই শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছে না ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে সামরিক ও অবকাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে সড়ক, যোগাযোগপথ ও বসতিগুলোর আশপাশের জমিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলে স্থানীয় ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর চলাচল ও ভূমি ব্যবহারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

পশ্চিম তীরের ভূমি নিয়ে বিরোধের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত সংকট। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে পশ্চিম তীর ইসরাইলের দখলে রয়েছে। সেখানে ইসরাইলি বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত বিষয়। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিরা পশ্চিম তীরকে ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে শত শত একর জমি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার খবর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়াতে পারে। কৃষিজমি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে স্থানীয় পরিবারগুলোর জীবিকা, কৃষিকাজ এবং নিজেদের ভূমিতে অবাধ চলাচলের সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ফিলিস্তিনি কমিশন জানিয়েছে, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ জুলাই মাসে ৩৩টি সামরিক আদেশ জারি করেছিল। কমিশনের হিসাবে, এর মধ্যে ৩১টি নতুন দখল আদেশ ছিল এবং সেগুলোতে বিপুল পরিমাণ ফিলিস্তিনি জমি লক্ষ্য করা হয়। এসব পদক্ষেপকে পশ্চিম তীরে নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের বৃহত্তর প্রবণতার অংশ হিসেবে দেখছে তারা।

এদিকে নতুন সামরিক আদেশের বিষয়ে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পৃথক কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়েছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা স্পষ্ট নয়। ফলে মারদার ২ হাজার ২২৪ দুনাম জমি দখলের সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রয়োগ, এর মেয়াদ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকদের জন্য কোনো আইনি প্রক্রিয়া থাকবে কি না—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।

তবে সামগ্রিকভাবে পশ্চিম তীরে ভূমি নিয়ন্ত্রণের এই প্রবণতা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। মারদায় ৫৫০ একর জমি দখলের সর্বশেষ আদেশ সেই দীর্ঘস্থায়ী সংকটেরই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত