হেফাজতের ৯ দফা দাবি: কমেছে সংখ্যা, যুক্ত হয়েছে নতুন প্রসঙ্গ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার
হেফাজতের ৯ দফা দাবি: কমেছে সংখ্যা, যুক্ত হয়েছে নতুন প্রসঙ্গ
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের দাবিদাওয়ায় পরিবর্তন এনেছে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী কওমি আলেমদের সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। ২০১৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৩ দফা দাবি তুলে সারা দেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেওয়া এই সংগঠনটি এবার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ৯ দফা দাবি পেশ করেছে। সময়ের পরিক্রমায় হেফাজতের দাবির সংখ্যা কমলেও এর মূল আদর্শ ও ধর্মীয় দাবিগুলোর বড় একটি অংশ অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক সমীকরণ এবং বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে কিছু নতুন প্রসঙ্গ যুক্ত হয়েছে এবারের দাবিতে, যা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত রোববার যখন সরকারি সফরে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নানা কর্মসূচির ফাঁকে তিনি ফটিকছড়ির ঐতিহ্যবাহী আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় উপস্থিত হন এবং হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রী ওই মাদ্রাসায় পৌঁছালে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান হেফাজত আমির। এরপর সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মূলত সেই বৈঠকেই হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এই ৯ দফা দাবিটি প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হেফাজত অতীতে সরকারের কাছে যেসব দাবি পেশ করেছিল, তার মধ্যে কিছু বিষয় নিয়ে তারা নিজেরাই আশ্বস্ত হয়েছে কিংবা পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় দাবিগুলোর প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে। যেমন, অতীতে তাদের দাবির শীর্ষে থাকা সংবিধানের মূলনীতিতে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপনের বিষয়টি এবারকার ৯ দফা দাবি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সংগঠনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী গণমাধ্যমকে জানান, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আগেই ঘোষণা করেছিল যে তারা সংবিধানের মূলনীতিতে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস সংযোজন করবে এবং ইতিমধ্যে এসংক্রান্ত বিল সংসদে পাস হয়েছে। ফলে এই নির্দিষ্ট দাবিটির পুনরাবৃত্তির আর কোনো প্রয়োজন নেই বলে মনে করেছে সংগঠনটি।
তবে এবারের দাবিতে বেশ কিছু নতুন এবং চাঞ্চল্যকর বিষয় যুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি করেছে হেযবুত তওহীদ নামের একটি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার দাবি। হেফাজত নেতাদের অভিযোগ, হেযবুত তওহীদ ইসলাম ধর্মকে বিকৃত করছে এবং সমাজে নানা ধরনের ফিতনা বা বিশৃঙ্খলা ছড়াচ্ছে। তাদের এই তৎপরতা দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ বলে দাবি করে হেফাজত নেতারা অবিলম্বে এই সংগঠনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন। অতীতে কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণার দাবিটি যেভাবে হেফাজতের প্রতিটি তালিকায় অবধারিতভাবে থাকত, ঠিক তেমনি এবার হেযবুত তওহীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির দাবিটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এ ছাড়া কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমানের স্বীকৃতির কার্যকর বাস্তবায়নের বিষয়টি এবার অত্যন্ত জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ২০১৭ সালে তৎকালীন সরকার দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তরের সমমান দিলেও কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এর সুফল শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে হেফাজত। সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে সরকারি মাদ্রাসার ডিগ্রির পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রির স্পষ্ট উল্লেখ এবং উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ সৃষ্টির দাবি জানানো হয়েছে। অতীতে কওমি সনদের স্বীকৃতি নিয়ে বিভিন্ন সরকার ও সংগঠনের সঙ্গে নানা নাটকীয়তা চললেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সরকারের সদিচ্ছা কামনা করছেন আলেমসমাজ।
বিগত বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটের বিচার প্রসঙ্গটিও স্থান পেয়েছে এবারের ৯ দফা দাবিতে। ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে রাতের আঁধারে সংঘটিত নৃশংস ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছে হেফাজত। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতা এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত ট্রাইব্যুনালে এসব ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও এর স্বচ্ছতা ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন হেফাজত নেতারা।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ২০১১ সালে তৎকালীন সরকার যখন জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ঘোষণা করে, তখন থেকেই মূলত রাজপথে সরব হতে শুরু করে হেফাজতে ইসলাম। নীতিমালায় সম্পত্তি ও আয়ের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের বিধানকে ইসলামি শরিয়াহ ও কোরআনের উত্তরাধিকার আইনের পরিপন্থী বলে ঘোষণা করেন আলেমেরা। এরপর ২০১৩ সালে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন ও ধর্ম অবমাননার প্রতিবাদে ১৩ দফা দাবি নিয়ে রাজপথে নামে সংগঠনটি। ৫ মে শাপলা চত্বরে তাদের মহাসমাবেশ ও পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
পরবর্তী বছরগুলোতে সরকারের সঙ্গে নানা টানাপোড়েন ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে হেফাজতের কার্যক্রমে ভিন্নতা এসেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছেও ১২ দফা দাবি পেশ করেছিল তারা। বর্তমান রাজনৈতিক ধারায় বিএনপি সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পেশ করা এই ৯ দফা দাবি তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করা, ধর্মীয় শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং বিতর্কিত তৎপরতা বন্ধের মতো ইস্যুগুলোতে হেফাজতের এই নতুন অবস্থান আগামী দিনের রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় কতটা প্রভাব ফেলবে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত