বিনিয়োগের ক্ষেত্র খুঁজতে ঢাকায় ২৫ মার্কিন প্রতিষ্ঠান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার
বিনিয়োগের ক্ষেত্র খুঁজতে ঢাকায় ২৫ মার্কিন প্রতিষ্ঠান
প্রকাশ: ১১ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা এবং নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতি আস্থা রেখে দেশের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পথ খুঁজতে রাজধানী ঢাকায় এসে পৌঁছেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হেভিওয়েট প্রতিনিধিদল। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির এই দেশটির ২৫টি প্রভাবশালী কোম্পানির মোট ৪৭ জন প্রতিনিধি ও শীর্ষ নির্বাহী এই সফরে অংশ নিয়েছেন। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত থেকে শুরু করে সর্বাধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি, বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে বহুমুখী আর্থিক সেবাসহ দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিগুলো খতিয়ে দেখতে তারা বিভিন্ন সরকারি নীতিনির্ধারক ও শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন। এই সফরটিকে বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছেন দেশীয় অর্থনীতিবিদরা, যা আগামী দিনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের বিনিয়োগবান্ধব ভাবমূর্তি আরও সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটকের ভূমিকা পালন করবে।
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রতিনিধিদলের সদস্যরা গত রোববার ও সোমবার দফায় দফায় ঢাকায় এসে পৌঁছান। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে বিডার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ বৈঠকের মধ্য দিয়ে তাদের এই আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ও ব্যবসায়িক কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর সরকারের বিভিন্ন নীতিনির্ধারক মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য সংক্রান্ত বিভাগ এবং শীর্ষস্থানীয় শিল্প সংগঠনের সঙ্গেও তাদের পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে মার্কিন এই প্রতিনিধিদলের সফরটি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট আর্থিক বিনিয়োগের বড় অংক বা একক কোনো মেগা প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, বরং বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবসায়িক পরিবেশ, নীতিগত সংস্কার, আইনি সুরক্ষা এবং কোন কোন সেক্টরে বৈদেশিক বিনিয়োগের সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা ও মুনাফার সুযোগ রয়েছে—তার একটি প্রাথমিক ও গভীর অনুসন্ধান হিসেবেই এটিকে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সফর শেষে মার্কিন ব্যবসায়ীরা যখন ঢাকা ত্যাগ করবেন, তখন দেশের কোন কোন খাতে তারা পুঁজি বিনিয়োগ করতে পারেন, সে বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ও চিত্র পরিষ্কার হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মার্কিন ব্যবসায়ীদের এই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান শর্ত। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন এবং আধুনিক বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অংশীদারত্বের সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগরের অফশোর বা অতল সমুদ্রের তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাব্যতা মার্কিন বিনিয়োগকারীদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অফশোরের ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, যেখানে জ্বালানি খাতের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণের জন্য ব্রেন্টের দামের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, অর্জিত মুনাফা সহজে বিদেশে নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার সুবিধা এবং আকর্ষণীয় করপোরেট কর মওকুফসহ বিভিন্ন যুগোপযোগী প্রণোদনা রাখা হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের সঙ্গে মার্কিন জ্বালানি জায়ান্টগুলোর নিবিড় সম্পর্ক থাকায় অফশোর খাতের এই নতুন সুযোগটি তাঁদের জন্য দ্বিগুণ আগ্রহের জন্ম দিয়েছে।
জ্বালানির পাশাপাশি মার্কিন প্রযুক্তি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের আরেকটি প্রধান ও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে তথ্য-প্রযুক্তি এবং সফটওয়্যার খাত। দেশের হাইটেক পার্কগুলো, উদীয়মান সফটওয়্যার শিল্প, দেশজুড়ে বিস্তৃত ডাটা সেন্টার, আধুনিক ডিজিটাল অবকাঠামো এবং ক্রমবর্ধমান ই-কমার্স শিল্পে মার্কিন পুঁজি ও কারিগরি সহায়তার বিশাল ক্ষেত্র প্রস্তুত রয়েছে। দ্রুতগতির ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধি, নিরাপদ ডাটা প্রসেসিং এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তিভিত্তিক সেবার অভাবনীয় প্রসারের কারণে বাংলাদেশের ডিজিটাল মার্কেট এখন বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের নজরে এসেছে। একই সঙ্গে আধুনিক ফিনটেক বা আর্থিক প্রযুক্তি খাতেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম, সুরক্ষিত পেমেন্ট গেটওয়ে, ব্যাংকিং অটোমেশন এবং ডাটাভিত্তিক আর্থিক সেবার সম্প্রসারণ মার্কিন ফিনটেক জায়ান্টগুলোর জন্য নতুন ও উর্বর বাজার সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে তারা তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করার সুযোগ পাবে।
অবকাঠামো উন্নয়ন খাতেও বৈদেশিক বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্র খুঁজছেন মার্কিন প্রতিনিধিরা। দেশের আধুনিক সমুদ্রবন্দরগুলোর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইনের উন্নয়ন, পরিবহন সংযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে মার্কিন বিনিয়োগ ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা চলছে। বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রুত পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া চালু করা এবং সার্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে মার্কিন দক্ষতা অত্যন্ত কার্যকরী হতে পারে। যদিও বাংলাদেশে সিটিব্যাংক ও মেটলাইফের মতো বিশ্বখ্যাত মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ সময় ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে, তবুও নতুন করে বিপুল পরিমাণ মার্কিন পুঁজি আকর্ষণ করাটাই বর্তমান অর্থনৈতিক কূটনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন প্রতিনিধিদলের এই সফরকে কেবল সাধারণ ব্যবসায়িক আগ্রহ হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং কোন কোন খাতে জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনিয়োগ নেওয়া প্রয়োজন এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী নীতি সহায়তা ও আইনি নিশ্চয়তা প্রদান করা সম্ভব—সে বিষয়ে সরকারকে আরও বেশি সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ অবস্থান নিতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত