প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির নতুন ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক গভীর অস্থিরতা ও অসন্তোষের জন্ম নিয়েছে। আগামী ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ আয়োজনের হাতে এখনও প্রায় আঠারো মাস সময় বাকি থাকলেও, হঠাৎ করেই এই আসরের বাছাই প্রক্রিয়া এবং প্রতিযোগিতার মূল কাঠামো ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল। আর এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও নাটকীয় সিদ্ধান্তের জেরে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্কটল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের মতো প্রতিশ্রুতিশীল ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলো। আইসিসির এমন একপাক্ষিক ও হঠকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে ক্রিকেট স্কটল্যান্ড এবং রয়্যাল ডাচ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অত্যন্ত কঠোর ভাষায় একটি যৌথ বিবৃতি প্রদান করেছে। তাদের দাবি, বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে নিয়ম পরিবর্তনের মাধ্যমে উঠতি দেশগুলোর স্বপ্ন ও প্রচেষ্টাকে অবজ্ঞা করা হয়েছে এবং এর ফলে ক্রিকেটের বৈশ্বিক উন্নয়নের গতিপথ বাধাগ্রস্ত হবে।
গত মাসে স্কটল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আইসিসির বার্ষিক সাধারণ সভার সমাপ্তি টানার পরপরই ওয়ানডে বিশ্বকাপের পাশাপাশি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফরম্যাটেও বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা আসে। নতুন এই কাঠামোর মূল বিষয় হলো, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা দশ থেকে বাড়িয়ে চৌদ্দ করা হলেও, সব দলের জন্য মূল পর্বে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়নি। আইসিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্বকাপের মূল পর্বে সব দল সরাসরি খেলতে পারবে না। বরং পয়েন্ট টেবিলের ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর স্থানে থাকা দলগুলোকে একটি বিশেষ ‘সুপার সিরিজ’ বা প্লে-অফ রাউন্ডে অংশ নিতে হবে। সেই সিরিজ থেকে মাত্র একটি দল চূড়ান্তভাবে বিশ্বকাপে টিকে থাকার গৌরব অর্জন করবে এবং বাকি দুটি দল আসর থেকে বিদায় নেবে। এর ফলে দীর্ঘ পরিশ্রমের পর বিশ্বকাপ নিশ্চিত করা উঠতি দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত কঠিন ও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আইসিসির এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে স্কটল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের ক্রিকেট বোর্ড জানিয়েছে যে, বিশ্বকাপের মতো একটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের মাত্র দেড় বছর আগে এই ধরনের আমূল পরিবর্তন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তাদের মতে, সহযোগী দেশগুলো গত কয়েক বছরে নিজেদের খেলার মান অনেক উন্নত করেছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তারা নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছে। অথচ এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নিয়ম পরিবর্তন করে তাদের সুযোগ সংকুচিত করে দেওয়া হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলে ভুল বার্তা পাঠাচ্ছে। যে সময়ে ক্রিকেটের বিশ্বব্যাপী প্রচার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে এবং নতুন নতুন দেশে দর্শক টানার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এই ধরনের কঠোর নিয়ম উঠতি দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক এবং নিরুৎসাহিত করার শামিল। ক্রিকেটবিশ্বে শক্তিশালী জায়গা করে নেওয়ার জন্য যেসব দেশ কঠোর পরিশ্রম করছে, তাদের স্বপ্নকে গলা টিপে ধরার সামিল এই আইসিসির নতুন ফরম্যাট।
এদিকে বিশ্বকাপের এই নতুন বাছাই প্রক্রিয়ার কারণে সবচেয়ে বড় চমক ও ধাক্কা লেগেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য। আইসিসি পূর্বে জানিয়েছিল, ২০২৭ বিশ্বকাপের জন্য র্যাঙ্কিংয়ের কাট-অফ টাইম নির্ধারণ করা হবে ৩১ মার্চ ২০২৭ সালে। কিন্তু আচমকা এই তারিখ এগিয়ে এনে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে সরাসরি বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন এক প্রকার ধূলিসাৎ হয়ে গেছে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উইন্ডিজের। র্যাঙ্কিংয়ে নবম স্থানে থাকা বাংলাদেশের সরাসরি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেলেও, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবার টানা তৃতীয়বারের মতো বাছাইপর্বে খেলার মতো চরম ও হতাশাজনক পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। গত সোমবার রাতে বেলফাস্টে আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ডের মধ্যকার তৃতীয় ওয়ানডে ম্যাচ শেষে সমীকরণের হিসেবে ক্যারিবীয়দের সরাসরি খেলার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৯ ও ২০২৩ সালের পর টানা তিনবার বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে নামতে হওয়াটা ক্রিকেটবিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এই দলের জন্য বড় ধরনের লজ্জা ও অবমাননা হিসেবেই দেখছেন ক্রিকেট সমর্থকরা।
ওয়াল্ট ডিকেন্সের মতো ক্রিকেটের অনেক বোদ্ধা মনে করছেন যে, বড় দেশগুলোর আধিপত্য বজায় রাখার স্বার্থেই আইসিসি বারবার এমন জটিল ফরম্যাটের আশ্রয় নিচ্ছে, যা ছোট দেশগুলোকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বদলে পিছুটান দিচ্ছে। যদিও আইসিসি বরাবরই দাবি করে আসছে যে, ক্রিকেটের প্রসার এবং প্রতিযোগিতার মান বাড়াতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে, তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। স্কটল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলো, যারা তাদের সীমিত সম্পদ ও অবকাঠামো নিয়েই বড় বড় দলের সাথে সমানে পাল্লা দিয়ে খেলছে, তাদের এমন অবজ্ঞা করা হলে বিশ্ব ক্রিকেটের সামগ্রিক কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। একদিকে যখন ক্রিকেটের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর ঢাক পেটানো হচ্ছে, অন্যদিকে তখন আইসিসির এমন বৈষম্যমূলক নীতি তাদের সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভবিষ্যতের এই ওয়ানডে বিশ্বকাপ ঘিরে এখন কেবল স্কটল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডস নয়, বরং সারাবিশ্বের ক্রিকেটপ্রেমীদের মনেই নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। আইসিসি কি আসলেই ক্রিকেটের বিশ্বায়নে বিশ্বাসী, নাকি তারা কেবল নির্দিষ্ট কিছু দেশ ও তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থের সুরক্ষায় নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে চায়—এমন প্রশ্নই এখন জোরালোভাবে উঠছে। স্কটল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের বোর্ডের পক্ষ থেকে আইসিসিকে পুনরায় এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা চাইছে, বিশ্বকাপের নিয়ম যেন সবার জন্য সমান এবং স্বচ্ছ হয়, যাতে কঠোর পরিশ্রমে উঠে আসা দেশগুলোর প্রতি অন্যায় না হয়। এখন দেখার বিষয়, আইসিসি কি তাদের অবস্থান থেকে সরে আসে, নাকি বিশ্ব ক্রিকেটের এই অস্থিরতা আরও তীব্রতর হয়। ক্রিকেটের স্বার্থেই এই সমস্যার একটি যৌক্তিক সমাধান প্রয়োজন, যাতে প্রতিযোগিতার মূল সুর বা জৌলুস কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয় এবং সব দেশ সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকার বজায় রাখতে পারে।