প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি এবং অপরাধ দমনের ধারাবাহিক অভিযানের মুখে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অতিষ্ঠ করে তোলা, চাঁদাবাজি, খুন এবং অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র যখন শক্ত অবস্থান নিয়েছে, ঠিক সেই সময়ে চট্টগ্রামের অপরাধ জগতেও বইছে আইনি প্রক্রিয়ার কড়া হাওয়া। সম্প্রতি চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানায় দায়েরকৃত একটি চাঞ্চল্যকর চাঁদাবাজির মামলায় এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের আরও পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বিচারিক প্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় বুধবার চট্টগ্রাম জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট লোকমান হাকিমের আদালতে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয় এবং বিচারক উভয় পক্ষের আইনি যুক্তি শুনে এই বহুল আলোচিত রিমান্ডের আদেশ প্রদান করেন।
আদালত ও তদন্তকারী সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, হাটহাজারী থানায় দায়ের করা ওই সুনির্দিষ্ট চাঁদাবাজির মামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের আরও নিবিড় ও গভীরভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে আদালতে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে জোরদার আবেদন করা হয়েছিল। মামলার তদন্তের স্বার্থে এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সহযোগীদের খুঁজে বের করতে এই রিমান্ডের প্রয়োজনীয়তা পুলিশ আদালতকে স্পষ্টভাবে অবহিত করে। বিজ্ঞ আদালত পুলিশ কর্তৃক পেশকৃত নথিপত্র এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে শুনানি শেষে আসামির পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের চূড়ান্ত নির্দেশ দেন। এর আগেও গত দুই আগস্ট একই চাঁদাবাজির মামলায় চট্টগ্রাম জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোতাসিম বিল্লাহর আদালতে তাকে হাজির করা হয়েছিল এবং আদালত সেই সময় তার দশ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন। বারবার রিমান্ড মঞ্জুর হওয়া এবং একের পর এক আইনি জালে এই শীর্ষ সন্ত্রাসীর আটকে পড়া প্রমাণ করে যে, অপরাধ জগতের গভীরে থাকা অন্ধকার নেটওয়ার্ক উন্মোচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

চট্টগ্রাম জেলার বিজ্ঞ কোর্ট পরিদর্শক হাবিবুর রহমান গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান যে, হাটহাজারী থানার চাঞ্চল্যকর চাঁদাবাজির মামলায় আসামি ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে পুলিশ সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিল। পরবর্তীতে আদালত অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে শুনানি সম্পন্ন করে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করার এই আদেশ দেন। এই ধারাবাহিক আইনি প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর এক গোয়েন্দা অভিযানের ইতিহাস। গত ছাব্বিশে জুলাই ঝিনাইদহ বা যশোর অঞ্চলের দিকে এক রুদ্ধশ্বাস অভিযানে যশোরের কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে ডেভিড ইমনসহ মোট চারজন দুষ্কৃতকারীকে যৌথভাবে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জেলা পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায় যে, গত তেরো জুন পাহাড়তলী থানা এলাকায় চাঞ্চল্যকর মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্লু বা সূত্র পায়। সেই সূত্র ধরে ধারাবাহিক ও নিখুঁত গোয়েন্দা তৎপরতা চালিয়েই অবশেষে এই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীর সঠিক অবস্থান শনাক্ত করতে সফল হয় পুলিশ।
গ্রেপ্তার করার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে এই চক্রের কাছ থেকে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। অপরাধীদের দেওয়া সেই নিখুঁত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গত ত্রিশ জুলাই ভোরের আলো ফোটার আগেই ফটিকছড়ির দুর্গম কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর এলাকার একটি নির্জন ও পরিত্যক্ত বসতবাড়িতে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। সেই পরিত্যক্ত ঘর তল্লাশি করে একটি অত্যাধুনিক বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় তৈরি এলজি এবং অন্যান্য মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করা হয়, যা এই সন্ত্রাসী চক্রের বিশাল নাশকতার পরিকল্পনার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। পুলিশের অপরাধ তথ্য বিভাগ বা ডাটাবেজ সূত্রে জানা যায় যে, এই ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে কেবল একটি বা দুটি নয়, বরং চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন থানায় হত্যা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অবৈধ অস্ত্র রাখা এবং চাঁদাবাজিসহ গুরুতর অপরাধের মোট তেরোটি মামলা ঝুলছে। শুধু তাই নয়, একাধিক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সে বিষয়েও বর্তমানে গভীর ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশের বিশেষ টিম।

সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্ত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের ভয়ে তটস্থ ছিলেন। দিনের পর দিন সাধারণের রক্ত চুষে খাওয়া অপরাধীরা যখন ধরা পড়তে শুরু করেছে, তখন সমাজে এক ধরনের স্বস্তি ফিরে আসছে। ডেভিড ইমনের মতো শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একের পর এক রিমান্ডে নেওয়া এবং তাদের অপরাধ সাম্রাজ্যের নেপথ্য নায়কদের খুঁজে বের করার এই প্রক্রিয়াটি দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলার জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা বহন করে। বিচারব্যবস্থার কঠোর নজরদারির মাধ্যমে অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে তা ভবিষ্যতে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হওয়া থেকে সমাজকে রক্ষা করবে। আদালত প্রাঙ্গণে এই মামলার পরবর্তী কার্যক্রম এবং তদন্তের অগ্রগতি জানার জন্য এখন সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমকর্মীরা গভীর আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছেন।