বরফ সংকটে মৎস্যকেন্দ্রে আটকা পাঁচ শতাধিক মাছ ধরার ট্রলার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৮ বার
বরফ সংকটে মৎস্যকেন্দ্রে আটকা পাঁচ শতাধিক মাছ ধরার ট্রলার
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র পটুয়াখালীর মহিপুর ও আলীপুর এলাকা জুড়ে বর্তমানে এক গভীর ও উদ্বেগজনক সংকট বিরাজ করছে। মৌসুমের ভরা সময়েও বরফের তীব্র ঘাটতি এবং বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে থমকে গেছে পুরো এলাকার মৎস্য অর্থনীতি। সাগরে গিয়ে ইলিশ শিকার করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন থাকলেও বরফ না পাওয়ার কারণে মহিপুর-আলীপুর মৎস্য অবতরণ ঘাটে অলস বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন হাজার হাজার জেলে। ঘাটের বিভিন্ন পয়েন্টে নোঙর করে রাখা হয়েছে পাঁচ শতাধিক মাছ ধরার ফিশিং ট্রলার। বরফের অভাবে সাগরে যেতে না পেরে ট্রলার মালিক, জেলে এবং আইস প্লান্টের ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন, যা উপকূলীয় এই জনপদের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এক বড় ধরনের স্থবিরতা ডেকে এনেছে।
স্থানীয় বরফকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান সময়ে নদী ও সাগরে পর্যাপ্ত ইলিশ পাওয়ার কথা থাকলেও মূলত বিদ্যুৎ সরবরাহের চরম বিপর্যয়ই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। মহিপুর-আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ফয়সাল আইসপ্লান্টের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর হোসেন চরম হতাশা প্রকাশ করে জানান যে, আইস প্লান্ট চালাতে প্রতি মাসে বিশাল অঙ্কের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয়, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সার্বক্ষণিক লোডশেডিংয়ের কারণে কোনোভাবেই চাহিদা অনুযায়ী বরফ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। দিনের পর দিন বরফ উৎপাদন বন্ধ থাকায় উৎপাদক থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা—সব স্তরের ব্যবসায়ীরাই মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। একই কথা জানান জননী আইস প্লান্টের স্বত্বাধিকারী কবির হোসেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বরফ না থাকলে জেলেরা কোনোভাবেই সাগরে মাছ শিকারে যেতে পারবেন না, আর সাগরে না গেলে মাছ মিলবে না। মাছের ব্যবসা সম্পূর্ণ বরফনির্ভর হওয়ায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রতিদিন তার বড় অঙ্কের আর্থিক লোকসান গুণতে হচ্ছে।
বরফ সংকটের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সাধারণ জেলে ও ট্রলার মালিকদের দৈনন্দিন কার্যক্রমে। মহিপুর-আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ট্রলার মালিক রেজাউল মাতুব্বর ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, সাগরে যাওয়ার সব প্রস্তুতি নিয়ে দিনের পর দিন ঘাটে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, কিন্তু বরফের দেখা মিলছে না। কবে নাগাদ বরফ সংগ্রহ করে আবার সাগরে রওনা দিতে পারবেন, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। আরেক ট্রলার মালিক আইয়ুব দফাদার জানান, সাগর থেকে কষ্টার্জিত ইলিশ নিয়ে ঘাটে ফেরার পর বরফের চরম সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে তাদের অত্যন্ত কম দামে মাছ বিক্রি করে দিতে হয়েছে, যা তাদের পুঁজি হারানোর উপক্রম করেছে। পটুয়াখালী শহরের নিশাদ আইস প্লান্টের ব্যবস্থাপক নুরুল রহমান সুজনও একই ধরনের সংকটের কথা তুলে ধরে জানান যে, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বড়জোর এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ায় কোনোভাবেই বরফ ব্লক তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে বর্তমানে ইলিশের ভরা মৌসুম হওয়ায় নদী ও সাগরে প্রচুর মাছ পাওয়ার উপযুক্ত সময় এটি। এ সময়ে সাধারণত জেলেরাসহ সংশ্লিষ্ট সবাই অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেন এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হন। কিন্তু এ বছর ভরা মৌসুমের ঠিক এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বরফের তীব্র সংকটের কারণে মহিপুর ও আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এক ভুতুড়ে রূপ ধারণ করেছে। মহিপুর-আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রাজু আহমেদ রাজ পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন যে, বরফের অনুপস্থিতির কারণে পুরো মৎস্য ব্যবসায়ে ধস নেমেছে এবং বেচাকেনা প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। বরফ ছাড়া সামুদ্রিক মাছ সংরক্ষণ করা অসম্ভব হওয়ায় বর্তমানে পাঁচ শতাধিক ফিশিং ট্রলার বাধ্য হয়ে ঘাটে আটকে রয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ বেকার সময় কাটাচ্ছেন।
বিদ্যুৎ সরবরাহের এই করুণ অবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করে পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার আবুল কাশেম জানান, পটুয়াখালীর সামগ্রিক গ্রিডগুলোতে বিদ্যুতের যে পরিমাণ চাহিদা রয়েছে, তার তুলনায় অনেক কম সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে কলাপাড়া, কুয়াকাটা, আমতলী ও তালতলী এলাকা নিয়ে গঠিত পায়রা গ্রিডে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় এই সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। একই অবস্থা বিরাজ করছে বাউফল, গলাচিপা, দশমিনা, মির্জাগঞ্জ, দুমকী ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত পটুয়াখালী গ্রিডেও। বিদ্যুতের এই বিরাট ঘাটতির কারণে ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে, যা সরাসরি বরফকলগুলোর উৎপাদন ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যশিল্পকে রক্ষা করতে দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মৎস্যজীবীরা।
উত্তরাঞ্চল ও উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্যজীবীদের জীবনযাত্রায় বরফ সংকট এবং বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ফলে সৃষ্ট বহুমুখী সংকটের কারণে মহিপুর ও আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে পাঁচ শতাধিক মাছ ধরার ট্রলার আটকা পড়ার ঘটনাটি কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক সামুদ্রিক মৎস্য অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধরনের অশনিসংকেত। মৌসুমের ভরা সময়ে যখন নদী ও সাগরে প্রচুর পরিমাণে ইলিশ পাওয়ার কথা, ঠিক সেই মুহূর্তে বরফের তীব্র ঘাটতি ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে জেলে, ট্রলার মালিক এবং বরফকলের ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক লোকসানের মুখমুখি হয়েছেন। এই সংকট নিরসনে এবং উপকূলীয় মৎস্য অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত