প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী খবর সামনে এসেছে। নতুন বেতন কাঠামোতে প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ একশ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করেছে উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি। তবে এই বেতন বৃদ্ধি সব গ্রেডে সম্পূর্ণ সমান হারে কার্যকর করা হবে না, বরং গ্রেড ভেদে এর হার কিছুটা কমবেশি হতে পারে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি চাকুরের জীবনমান উন্নত করার লক্ষে এই সুপারিশ করা হয়েছে। জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫-এর সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির সাম্প্রতিক এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা দেশের লাখ লাখ সরকারি চাকরিজীবী ও তাদের পরিবারের মাঝে এক ধরনের স্বস্তি ও নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সচিব কমিটির চূড়ান্ত বৈঠক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, কমিটির শেষ বৈঠকে বেতন বাড়ানোর চূড়ান্ত এই প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সকল সদস্য সর্বসম্মতভাবে স্বাক্ষর করেছেন। নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় প্রথম থেকে বিংশ গ্রেড পর্যন্ত সকল সরকারি চাকরিজীবীর মূল বেতন সর্বোচ্চ একশ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত করার ব্যাপারে সবাই একমত পোষণ করেছেন। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি একবারে কার্যকর না করে আগামী দুই ধাপে বা দুই বছরে এই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই দ্বি-স্তর বিশিষ্ট বাস্তবায়নের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম বছরে শুধুমাত্র মূল বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি কার্যকর করা হবে এবং এর পরবর্তী বছর বা দ্বিতীয় ধাপে বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতাগুলো ধাপে ধাপে প্রদান করা হবে। তবে সচিব কমিটির এই সুপারিশ চূড়ান্ত হলেও মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদনের ওপর এর বাস্তবায়ন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে।

নতুন এই বেতন কাঠামো ও পে স্কেল নিয়ে দীর্ঘ পর্যালোচনা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন কোনো পে স্কেল কার্যকর না হওয়ায় কর্মচারীদের মধ্যে একধরনের চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছিল। যদিও এর মাঝে প্রতিবছর মূল বেতনের সঙ্গে নির্দিষ্ট ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হতো, তবুও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে তা পর্যাপ্ত ছিল না। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারি কর্মচারীদের বেতনের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয় এবং একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। সেই কমিটির দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা বিচার-বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন পে কমিশনের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে অবশেষে এই যুগান্তকারী প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত হওয়ার পর এখন পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অর্থ বিভাগের মাধ্যমে তা প্রধানমন্ত্রীর সমীপে উপস্থাপন করা হবে এবং তার সম্মতি সাপেক্ষে আগামী সপ্তাহের মধ্যেই মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদনের জন্য তোলা হবে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার মাঝে কিছু জটিলতা বা অতিরিক্ত সময়ের আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। জানা গেছে, বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য গত এপ্রিল মাসে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠিত হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি সরকার জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন ২০২৫-এর প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও সুপারিশ প্রণয়নের জন্য অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে পৃথক আরেকটি মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। ফলে সচিব কমিটি তাদের প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা সত্ত্বেও নতুন এই মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটির কারণে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের চূড়ান্ত রূপরেখা পেতে কিছুটা অতিরিক্ত সময় লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সচিব কমিটির একাধিক দায়িত্বশীল সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, তাদের মূল দায়িত্ব ছিল জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটির দাখিল করা বিশাল প্রতিবেদনগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য একটি কার্যকর সুপারিশমালা তৈরি করা। তারা সেই দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছেন এবং সকলের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা করেই এই সুপারিশ দিয়েছেন। এদিকে সাবেক অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে জানিয়েছেন যে, বিগত ২০১৫ সালের পে স্কেলটিও দুই ধাপে অত্যন্ত সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, যেখানে প্রথম বছরে মূল বেতন এবং পরের বছরে বিভিন্ন ভাতা প্রদান করা হয়েছিল। তার মতে, বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে পে স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়ন করাটাই সবচেয়ে বেশি বাস্তবসম্মত এবং সচিব কমিটি এই দুই ধরনের প্রস্তাবই মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করতে পারে, যা পরবর্তীতে মন্ত্রিসভার সভার বিচারে চূড়ান্ত রূপ লাভ করবে।

জাতীয় বাজেটের হিসাব-নিকাশ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন এবং বিভিন্ন ভাতা বাবদ প্রায় উননব্বই হাজার আটশ ছত্রিশ কোটি টাকা সুনির্দিষ্টভাবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে পেনশন ও গ্র্যাচুইটির মতো দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক খাতগুলো যুক্ত করলে এই অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ একচল্লিশ হাজার চারশ চৌত্রিশ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, বাজেটের জনপ্রশাসন-নিট খাতে এবার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রায় চুয়ান্ন হাজার পাঁচশ বাহাত্তর কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকারের এই বিশাল অংকের আর্থিক বরাদ্দ স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রস্তুতি ও সদিচ্ছা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং খুব দ্রুতই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।