৪৯১ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কাজ সাড়ে তিন বছরেও শুরু হয়নি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৯ বার
৪৯১ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কাজ সাড়ে তিন বছরেও শুরু হয়নি
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং বিভাগীয় শহর খুলনার জীবনযাত্রা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলার লক্ষে গৃহীত প্রায় পাঁচশ কোটি টাকার একটি বিশাল উন্নয়ন প্রকল্প দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর ধরে থমকে রয়েছে। খুলনা সিটি করপোরেশন বা কেসিসি এলাকার সামগ্রিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত সুরক্ষার উদ্দেশ্যে চারশ একাানব্বই কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পটি একনেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হলেও আজ পর্যন্ত এর কোনো উল্লেখযোগ্য ভৌত কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। এই দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে একদিকে যেমন প্রকল্পের নির্ধারিত ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি নগরবাসীর দৈনন্দিন দুর্ভোগ ও কষ্ট দিন দিন চরম আকার ধারণ করছে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ শুরু না হওয়ায় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রকল্পের ভবিষ্যৎ সাফল্য নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মারাত্মক ক্ষতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য খুলনা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে এগিয়ে এসেছিল জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা কেএফডব্লিউ। আন্তর্জাতিক এই দাতা সংস্থাটি খুলনা অঞ্চলের উন্নয়নে প্রায় তিনশ কোটি টাকা অনুদান হিসেবে প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছিল। দাতা সংস্থার এই সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে ২০২৩ সালের ১৭ জানুয়ারি তারিখের একনেক সভায় চারশ একাানব্বই কোটি টাকার এই महत्त्वाভৌতিক প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালেই এই প্রকল্পের কাজ পুরোদমে শুরু হওয়ার কথা ছিল এবং ২০২৭ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে পুরো কাজ সম্পন্ন করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আড়াই বছর পেরিয়ে আজ সাড়ে তিন বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ের কোনো দৃশ্যমান কাজই শুরু করা যায়নি।
মূল প্রকল্পের নকশা ও কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী এই বিশাল বাজেটের আওতায় নগরীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাল খনন এবং খালের দুই পাড় বাঁধাই করার কথা ছিল। যার মধ্যে রয়েছে নিরালা খাল, বাস্তুহারা খাল এবং দেয়ানা চৌধুরী খাল। এছাড়া ওই সমস্ত খালের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য আধুনিক ড্রেন নির্মাণ, দৌলতপুর এলাকায় শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ, নগরীর বৃষ্টির জমা পানি দ্রুত নিষ্কাশন করতে লবণচরা এলাকায় একটি আধুনিক পাম্প হাউস স্থাপন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে এলাকার কুড়িটিরও বেশি প্রাচীন পুকুর সংস্কারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, প্রকল্প অনুমোদনের এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও এসব উন্নয়নমূলক কাজের কোনোটিরই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। সময়মতো কাজ শুরু না হওয়ায় প্রকল্পটির ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
প্রকল্পের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ ও হতাশার চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল সংযোগ সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে চরম বেহাল ও চলাচলের অনুপযোগী অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয় এবং জলাবদ্ধতার কারণে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। স্থানীয় সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম অত্যন্ত ক্ষোভের সুরে জানান যে, গত তিন বছর ধরে তারা শুধু শুনে আসছেন যে রাস্তার বড় সংস্কার কাজ শুরু হবে, অথচ বাস্তব ক্ষেত্রে প্রতিদিন তাদের এই চরম ভাঙা ও ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা দিয়েই অত্যন্ত কষ্ট করে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এছাড়া রূপসা ও ভৈরব নদের অব্যাহত ভাঙন থেকে খুলনা শহরকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করতে দৌলতপুর এলাকায় শক্তিশালী শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং মহেশ্বরপাশা শ্মশানঘাট এলাকায় নতুন ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের যে জোরালো দাবি ছিল, তাও দীর্ঘসূত্রতার কারণে থমকে আছে।
প্রকল্পের নানা অসঙ্গতি ও জটিলতার কারণে এর পরিধিও ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে আসছে। নগরীর প্রাকৃতিক জলাধারগুলো টিকিয়ে রাখার মহৎ উদ্দেশ্যে শুরুতেই বাইশটি পুকুর সংস্কারের বড় পরিকল্পনা থাকলেও অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও বিভিন্ন জটিলতার কারণে সেই সংখ্যা কমিয়ে এখন মাত্র সতেরটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও দীর্ঘায়িত হলে এই পুকুরগুলোর অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া প্রকল্পের প্রথম প্যাকেজের কাজ হিসেবে সোনাডাঙ্গা বাইপাস রোডের মাত্র চারশ মিটার অংশ পুনর্নির্মাণের জন্য কেসিসি যখন প্রথম দরপত্র আহ্বান করেছিল, তখন সেখানে আটজন ঠিকাদার অংশ নেওয়ার জন্য দরপত্র জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, দাতা সংস্থার নির্দিষ্ট শর্তগুলো যথাযথভাবে পূরণ না করায় সেই জমা পড়া সবগুলো দরপত্রই বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ, যা প্রশাসনিক অদক্ষতারই এক সুস্পষ্ট প্রমাণ।
প্রকল্পের এই ভয়াবহ দীর্ঘসূত্রতার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কেসিসির প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক আবিরুল জব্বার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ২০২৩ সালে প্রকল্প অনুমোদনের পর ২০২৪ সালে দেশে ঘটে যাওয়া বড় ধরনের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নকশা তৈরির দায়িত্বে নিয়োজিত বিদেশি পরামর্শকরা হঠাৎ করে দেশ ছেড়ে চলে যান। যার ফলে টানা সাত থেকে আট মাস প্রকল্পের সমস্ত কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে কোনো রাজনৈতিক সরকার না থাকায় নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক দেরি হয় এবং নথিপত্র চালাচালিতে প্রচুর সময় নষ্ট হয়। তিনি আরও জানান যে, আলুতলা ও লবণচরা এলাকায় পাম্প স্টেশন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মালিকানাধীন থাকায় সেই জমি আইনগতভাবে ব্যবহারের অনুমতি পেতেই দীর্ঘ দুই বছর সময় ব্যয় হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি দাতা সংস্থার কঠোর শর্ত মেনে জমি অধিগ্রহণের পর ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রণয়ন, পরিবেশগত ছাড়পত্র সংগ্রহ এবং সামাজিক প্রভাবের বিশদ প্রতিবেদন প্রস্তুত করার প্রতিটি ধাপেই দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা পার হতে হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক আরও একটি জটিলতার কথা উল্লেখ করে জানান যে, দুই বছরেরও বেশি সময় চেষ্টার পর সম্প্রতি লবণচরা স্লুইসগেটের পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ড দুই একর জমি বুঝিয়ে দিলেও মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখা যায় যে সেই জমির কিছু অংশ অন্য ব্যক্তিদের নামে রেজিস্ট্রি করা রয়েছে। এই আইনি জটিলতা ও মালিকানা বিরোধ সমাধান না করে সেখানে কোনোভাবেই ভৌত কাজ শুরু করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে প্রস্তাবিত শহর রক্ষা বাঁধের আশপাশে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা ও ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে। দাতা সংস্থার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, যথাযথ পুনর্বাসন ছাড়া কোনো অবস্থাতেই তাদের উচ্ছেদ করা যাবে না। আর এই বিপুল সংখ্যক অবৈধ বসবাসকারীকে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হওয়ায় প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি মারাত্মকভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান অত্যন্ত যৌক্তিক প্রশ্ন তুলে বলেছেন যে, দাতা সংস্থার শর্তাবলী, জমির মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা পুনর্বাসনের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রকল্প একনেকে চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের আগেই সুরাহা করা উচিত ছিল। তা না করে প্রকল্প পাস করানোর পর অজুহাত দেখানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবের নামে বরাদ্দকৃত শত শত কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পটি দ্রুত সমস্ত আমলাতান্ত্রিক ও আইনি জটিলতা কাটিয়ে বাস্তবে রূপ লাভ করবে এবং খুলনাবাসী এর সুফল ভোগ করতে পারবে—এমনটাই এখন এই অঞ্চলের আপামর জনসাধারণের একটাই প্রাণের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত