পাহাড় থেকে সেনা প্রত্যাহারের দাবির কঠোর সমালোচনা নুরুল হকের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৪ বার
পাহাড় থেকে সেনা প্রত্যাহারের দাবির কঠোর সমালোচনা নুরুল হকের
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের স্পর্শকাতর জনপদ এবং দেশের সার্বিক সার্বভৌমত্ব রক্ষাকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে এক তীব্র আলোচনা ও বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চল থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের যে ধরনের অযৌক্তিক ও দূরভিসন্ধিমূলক দাবি বিভিন্ন মহল থেকে উত্থাপন করা হচ্ছে, তার তীব্র নিন্দা ও কঠোর সমালোচনা করেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক। দেশের অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা বজায় রাখার স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে কখনোই নিরাপত্তা বাহিনী বা সেনা ক্যাম্প সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয় বলে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে মন্তব্য করেছেন তিনি। সম্প্রতি রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ভূরাজনৈতিক নানা ষড়যন্ত্রের বিষয়ে এই কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন, যা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
রাজধানীর ঐতিহাসিক জাতীয় প্রেসক্লাবে এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে ষড়যন্ত্র, সার্বভৌমত্বের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক এই বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। দেশের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং পার্বত্য অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার জন্য আয়োজিত এই সেমিনারে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেন যে, সেনাবাহিনীর কোনো নির্দিষ্ট কার্যপ্রণালী বা কার্যপদ্ধতি নিয়ে সামান্য সমালোচনা থাকতেই পারে এবং সেটি অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। সেই সমস্ত ছোটখাটো মতপার্থক্য বা সমালোচনা একান্তভাবেই আলাপ-আলোচনা ও পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করা সম্ভব। কিন্তু এর আড়ালে যারা সুদূরপ্রসারী এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সম্পূর্ণ সেনাবাহিনী তুলে নেওয়ার মতো আত্মঘাতী ও অবাস্তব দাবি উত্থাপন করে চলেছেন, তাদের রাষ্ট্র পরিচালনা, ভূরাজনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে ন্যূনতম কোনো ধারণাই নেই বলে তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় মন্তব্য করেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘমেয়াদী সংকটের পেছনের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক আরও উল্লেখ করেন যে, বিগত ১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশের কোনো কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্র অত্যন্ত সুকৌশলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি সুবিধাজনক ও ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে বা চাপে রাখার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানী তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি একটি অত্যন্ত গভীর ও সংবেদনশীল প্রশ্ন উত্থাপন করেন যে, দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের গভীরে সক্রিয় সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাতে আধুনিক মেশিনগানসহ এত ভারী অস্ত্র কোথা থেকে আসে এবং কে বা কারা তাদের এই ধরনের সুসংগঠিত সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করে? তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, আঞ্চলিক ভৌগোলিক অবস্থান ও বাস্তবতার নিরিখে ভারত ও মিয়ানমার ছাড়া অন্য কোনো বহিঃশত্রু বা দেশের পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ বা প্রশিক্ষণ দেওয়া অসম্ভব ব্যাপার। তাই বাহ্যিক এই উসকানি ও অস্ত্র চোরাচালান বন্ধ না হলে পার্বত্য অঞ্চলের স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না বলে তিনি মনে করেন।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং তথাকথিত ‘আদিবাসী’ শব্দচয়নের জটিল বিতর্ক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক বলেন যে, বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানের সাংবিধানিক পরিভাষা অনুযায়ী ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দটির ব্যবহারই আইনগত ও সামাজিকভাবে সর্বাধিক সঠিক ও গ্রহণযোগ্য। এই প্রসঙ্গে তিনি জোরালো যুক্তি দিয়ে বলেন যে, ‘আদিবাসী’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ হলো কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের একদম প্রথম বা আদি অধিবাসী। অথচ ঐতিহাসিক সত্য হলো যে, বাঙালি জাতি হাজার হাজার বছর ধরে এই পলিমাটির অঞ্চলে বসবাস করে আসছে এবং এরাই এই মাটির আসল সন্তান। ফলে পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে ঢালাওভাবে ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করার কোনো ঐতিহাসিক বা সাংবিধানিক ভিত্তি নেই, যা দেশের মূল জাতীয় ঐক্যের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরির অপচেষ্টা মাত্র।
দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা ব্যবস্থার ওপর বিদেশি প্রভাবের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক এক চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক দাবি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন যে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের ফুটপাতের সাধারণ হকার থেকে শুরু করে একেবারে সচিবালয়, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এবং এমনকি মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও ভারতের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’–এর সক্রিয় এজেন্ট ও গোপন সোর্স ছড়িয়ে রয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে এই ধরনের অভ্যন্তরীণ গোপন তৎপরতা কঠোরহস্তে দমন করা প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক হুমকি মোকাবিলা করার জন্যই আমাদের নিজস্ব শক্তিশালী সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রয়েছে, যাদের মূল এবং পবিত্র দায়িত্ব হলো এই সমস্ত গোপন এজেন্ট ও রাষ্ট্রবিরোধী শক্তিগুলোকে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা।
প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচিত সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের কিছু অংশের বৈরী আচরণের বিষয়টিও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো সময়জুড়ে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো একটি সুপরিকল্পিত ও সম্মিলিত প্রচারণা চালিয়েছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশ সরকারকে একটি মৌলবাদী এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনকারী রাষ্ট্র হিসেবে মিথ্যাভাবে ফুটিয়ে তোলা। দেশের জনগণ একটি গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা করার পর ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও উন্নত ও স্থিতিশীল হবে বলে আন্তরিক প্রত্যাশা করা হয়েছিল, কিন্তু প্রতিবেশী দেশটি এখনও অযৌক্তিক চাপ প্রয়োগ এবং দর-কষাকষির পুরনো ও কূটকৌশল নীতি অব্যাহত রেখে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন ও মালয়েশিয়া সফরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় সময়টিতে কৃত্রিমভাবে একটি মনগড়া সংখ্যালঘু ইস্যু সামনে এনে দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা সৃষ্টির অসৎ চেষ্টা চালানো হয়েছিল। সেমিনারে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং প্রধান অতিথির বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট সাইফুল্লাহ খান সেমিনারে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও সুদূরপ্রসারী দাবি পেশ করেন। যার মধ্যে প্রধান কয়েকটি দাবি ছিল পাহাড়ের সশস্ত্র ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে যৌথ অভিযানের মাধ্যমে পুরোপুরি প্রতিহত করা, বিগত দিনে সম্পাদিত পার্বত্য শান্তিচুক্তি পুনর্বিবেচনা বা রিভিউ করা, পার্বত্য অঞ্চলে সুনির্দিষ্টভাবে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের কাঠামোগত আওতায় নিয়ে আসা, দুর্গম পাহাড়ে সেনাবাহিনীর স্থায়ী ক্যাম্প এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবির বিওপির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা, সেনাবাহিনীর সদস্যদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ ঝুঁকি ভাতাসহ অন্যান্য যথাযথ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং পাহাড়ে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের সুচিকিৎসার জন্য আধুনিক মানের সুবিধা সংবলিত কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতাল বা সিএমএইচ স্থাপন করা।
সার্বিকভাবে এই সেমিনারের মূল প্রতিপাদ্য ও বক্তাদের আলোচনা থেকে এটি অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল বা সাধারণ প্রশাসনিক এলাকা নয়, এটি সরাসরি বাংলাদেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা এবং ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। পাহাড়ি অঞ্চল থেকে যেকোনো ধরনের সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে ফেলার দাবি দেশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার বিরুদ্ধে একটি গভীর চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই জাতীয় স্বার্থে দলীয় সীমানার ঊর্ধ্বে উঠে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও সুদৃঢ় করা এবং পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি, শৃঙ্খলা ও আইনের শাসন বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সকল রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে আরও বেশি সতর্ক ও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে—এমনটাই ছিল সেমিনারে অংশ নেওয়া অভিজ্ঞ বিশ্লেষক ও দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারকদের ঐকমত্যের সারসংক্ষেপ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত