টাকা ছাপিয়ে দুর্বল ব্যাংকের ধার ছাড়াল ৮৫ হাজার কোটি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৯ বার
টাকা ছাপিয়ে দুর্বল ব্যাংকের ধার ছাড়াল ৮৫ হাজার কোটি
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা তীব্র তারল্য সংকট এবং অনিয়ম-দুর্নীতির জেরে দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে টাকা ছাপিয়ে ঋণ সহায়তার পরিমাণ রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক এক তথ্যে জানা গেছে যে বিগত তিন মাসের ব্যবধানে নতুন করে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দিয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে চরম তারল্য সংকটে জর্জরিত দুর্বল বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে দেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট দধারের পরিমাণ ৮৫ হাজার কোটি টাকার অঙ্ক ছাড়িয়ে গেছে। গ্রাহকদের আমানতের টাকা সময়মতো ফেরত দিতে না পারা এবং ব্যাংকগুলোর ভেতরের আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম হওয়ায় এই বিশাল অংকের অর্থ ছাড় করতে বাধ্য হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও ব্যাংকগুলো এই বড় অঙ্কের ধার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পরিশোধ করতে পারেনি, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বিগত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দেশের ডজনখানেকেরও বেশি ব্যাংকে নজিরবিহীন লুটপাট ও অনিয়ম চালানো হয়েছিল, যার সঙ্গে এস আলমসহ প্রভাবশালী কয়েকটি গ্রুপ সরাসরি জড়িত ছিল। তৎকালীন সময়ে এই সংঘবদ্ধ লুটপাটের কারণে ব্যাংকগুলোর ভিত ভেতর থেকে কেঁপে ওঠে এবং তারা আর্থিকভাবে চরম দুর্বল হয়ে পড়ে। সরকারের শেষ সময়ে এসে ব্যাংকগুলোর এই ভঙ্গুর দশা সামাল দেওয়ার অজুহাতে টাকা ছাপিয়ে তারল্য সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করলে সেই ধারা অব্যাহত রাখা হয়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটলেও বিএনপি সরকারের বর্তমান সময়ে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের মতো ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাংকটি আবারও তীব্র অস্থিতিশীলতার মুখে পড়ে। ফলে বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে নতুন করে আবারও অর্থ ঢালতে হয়।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে এখন পর্যন্ত মোট তেরোটি ব্যাংককে টাকা ছাপিয়ে ৮৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি ধার প্রদান করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের আমলে প্রায় ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের আমলে এই সহায়তার পরিমাণ এক লাফে ৫১ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে। আর বর্তমান গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সময়ে নতুন করে আরও ১৭ হাজার কোটি টাকা ধার দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক খাত বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যাংকগুলো যে লুটপাট ও দুর্নীতির শিকার হয়ে এই শোচনীয় অবস্থায় পড়েছে, তা অনস্বীকার্য। তবে যেভাবে নিয়মিত টাকা ছাপিয়ে ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখার কৃত্রিম প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, তাতে কাঙ্ক্ষিত কোনো গুণগত বা কাঠামোগত উন্নতি হচ্ছে না। এভাবে অর্থ ঢেলে কত দিন একটি দুর্বল ব্যাংক সচল রাখা সম্ভব, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মনে বড় ধরনের প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে। যদিও এর মধ্যে কিছু ব্যাংক একীভূত বা মার্জ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তবে সেই প্রক্রিয়ার গতি অত্যন্ত মন্থর হওয়ায় সংকট কাটছে না।
এই সংকটের মূলে রয়েছে মূলত বিগত সরকারের আমলে ব্যাংক খাতের ক্ষতগুলো সুকৌশলে লুকিয়ে রাখার প্রবণতা। ২০২২ সালের শেষ দিক থেকেই এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বড় ধরনের ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ লোপাটের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেতে শুরু করে। তখন থেকেই আতঙ্কিত আমানতকারীরা ব্যাংকগুলো থেকে নিজেদের জমানো অর্থ তুলতে শুরু করলে চরম তারল্য সংকট দানা বাঁধতে শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বিধিবদ্ধ নগদ তারল্য বা সিআরআর এবং সরকারি সিকিউরিটিজ বা এসএলআর সংরক্ষণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। কিন্তু তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার নিয়ম ভেঙে উল্টো নানা অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতিঝিল অফিসের চলতি হিসাবের মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক কয়েকটি ব্যাংকের হিসাব ঋণাত্মক করে লেনদেন চালিয়ে যাওয়ার এই বিতর্কিত পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল, যা ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক পালাবদলের পর দায়িত্ব নিয়ে নতুন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এই ধরনের বেআইনি সুযোগ ও অনিয়মিত সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দিলেও বাস্তবতার চাপে তাঁকে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার দেওয়া বন্ধ বা সীমিত করা মাত্রই ব্যাংকগুলোর শাখাগুলোতে গ্রাহকদের হাহাকার ও চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়। মানুষ যখন জানতে পারে যে ব্যাংক থেকে টাকা তোলা যাচ্ছে না, তখন আস্থার সংকট চরমে পৌঁছায়। এই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রোধ করতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাধ্য হয়ে আবারও নতুন করে টাকা ছাপিয়ে ঋণ বিতরণ শুরু করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সহায়তার সবচেয়ে বড় অংশটি পেয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, যাকে দেওয়া হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। এরপরে রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, যাদের দেওয়া হয়েছে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এছাড়া এক্সিম ব্যাংক ১২ হাজার ১০ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১০ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংক ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংক ৫ হাজার ৪২০ কোটি টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা তারল্য সহায়তা পেয়েছে।
তালিকায় থাকা অন্যান্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবি ব্যাংক ৪ হাজার ২৭০ কোটি টাকা, গローバル ইসলামী ব্যাংক ৩ হাজার ৩ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ৬২৪ কোটি টাকা, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ২৫২ কোটি টাকা এবং পদ্মা ব্যাংক ২৫২ কোটি টাকা ধার গ্রহণ করেছে। সামগ্রিক এই পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে এভাবে অনির্দিষ্টকাল ধরে তারল্য সহায়তা চালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সমীচীন নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একপ্রকার বাধ্য হয়েই আমানতকারীদের সুরক্ষা ও আস্থাহীনতা রোধে এই সহায়তা দিচ্ছে, কারণ সাধারণ মানুষ তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত না পেলে পুরো আর্থিক খাতেই এক মহাবিপর্যয় নেমে আসতে পারে। কিন্তু এই সাময়িক ব্যবস্থার বাইরে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকগুলোকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে কঠোর তদারকি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত