প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রাঙামাটির ঐতিহাসিক কাপ্তাই হ্রদ আবারও তার বিপুল জলধারণ ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। টানা বর্ষণের ফলে লেকের পানির উচ্চতা বিপদসীমা অতিক্রম করায় সোমবার মধ্যরাতে কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৬টি জলকপাট খুলে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এই পানি এখন প্রতি সেকেন্ডে ৯ হাজার কিউসেক হারে কর্ণফুলী নদীতে নিঃসরিত হচ্ছে।
সোমবার দিবাগত রাত ১২টা ৬ মিনিটে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয় বলে নিশ্চিত করেছেন কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান। তিনি জানান, “রাত ১২টা ৬ মিনিটে আমরা প্রতিটি জলকপাট ৬ ইঞ্চি করে খুলে দিই। এতে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে।”
গত কয়েক দিনের লাগাতার বর্ষণ ও উজান থেকে আসা পানির চাপের কারণে কাপ্তাই লেকের পানি হঠাৎ করে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পায়। প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, “রোববার সন্ধ্যা ৬টায় পানির উচ্চতা ১০৭ ফুটে পৌঁছায়। এরপর সোমবার বিকেল ৩টায় আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে পানি ছাড়া হবে এবং সে বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়েও দিই। তবে পরবর্তীতে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমে যাওয়ায় আবারও একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সবাইকে জানানো হয় যে, মঙ্গলবার সকাল ৯টায় পানি ছাড়া হবে।”
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। হ্রদের পানির স্তর মুহূর্তে মুহূর্তে বেড়ে যেতে থাকায় কোনো ঝুঁকি না নিয়ে মধ্যরাতেই জলকপাট খুলে দেওয়া হয়। বিপদসীমা অতিক্রম করে কাপ্তাই লেকের পানির উচ্চতা যখন ১০৮.০৫ ফুটে পৌঁছায়, তখন আর বিলম্ব না করে তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এতে কোনো ধরনের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় পানি সম্পদ বিশ্লেষকেরা।
প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান ভাটি অঞ্চলের মানুষকে আতঙ্কিত না হতে আহ্বান জানিয়ে বলেন, “বর্তমানে পানি ছাড়ার কাজ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিচ্ছি।” তিনি জানান, যদি প্রয়োজন হয় তবে পানির প্রবাহ বাড়ানো বা কমানোর মতো সিদ্ধান্ত দ্রুততার সাথে নেয়া হবে।
এদিকে, কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত পাঁচটি ইউনিট সচল রয়েছে এবং এই পাঁচটি ইউনিটের মাধ্যমেও প্রতিনিয়ত ৩২ হাজার কিউসেক পানি কাপ্তাই লেক থেকে কর্ণফুলীতে ছাড়া হচ্ছে। এতে করে মূল হ্রদের পানির চাপ কিছুটা হ্রাস পেলেও পুরো ব্যবস্থাটি এখনো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে।
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পানির এই প্রবাহের ফলে কর্ণফুলী নদীর ভাটি অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও রাঙামাটির বিভিন্ন নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলগুলোতে জলাবদ্ধতা এড়াতে কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং কোনো প্রকার আতঙ্কের কারণ নেই। তবে ভবিষ্যতে ভারি বর্ষণের ধারা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
কাপ্তাই হ্রদ ও কর্ণফুলী নদী এলাকার মানুষ এই সময়ের মধ্যে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকা ছাড়াও মাছচাষ, নৌ-চলাচল ও হ্রদকেন্দ্রিক জীবিকা নির্ভর পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও প্রশাসনের যৌথ সমন্বয় এবং সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের বিপর্যয়ের খবর পাওয়া যায়নি।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রয়েছে এবং প্রয়োজনে আরও জলকপাট খোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
কাপ্তাই হ্রদের এই হঠাৎ পানির ঊর্ধ্বগতি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও আবহাওয়ার চরমতার একটি বার্তা হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে এটি আবারও মনে করিয়ে দিল যে, দেশের বড় হ্রদ ও নদীগুলোতে একটি আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা ও সমন্বিত বন্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা কতটা জরুরি।










