প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন, দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জটিল সমস্যার সমাধান এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদারের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক তৎপরতা সবসময়ই এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আন্তর্জাতিক কূটনীতির মাঠে নানা জল্পনা-কল্পনা ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেবে এবং দুই দেশের শীর্ষপর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সুরাহা কীভাবে হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের কৌতূহলের অন্ত নেই। ঠিক এমন একটি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বহুল আলোচিত সম্ভাব্য ভারত সফর কিংবা অন্য কোনো দেশের গুরুত্বপূর্ণ সফর এখনো পর্যন্ত কোনোভাবেই চূড়ান্ত রূপ লাভ করেনি।
রাজধানীর সেগুনবাগিচাস্থ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই তথ্য দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন। তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের জানান যে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে নানা মহলে যে গুঞ্জন বা আলোচনা শোনা যাচ্ছে, তার কোনো দাপ্তরিক বা চূড়ান্ত রূপ এখনো নির্ধারিত হয়নি। কেবল ভারত সফরই নয়, বরং অন্যান্য বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সরকারি সফরগুলোর সূচি বা দিনক্ষণও এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। দুই দেশের কূটনৈতিক শিষ্টাচার, পারস্পরিক আলোচনার টেবিলে বসা এবং উভয়ের সুবিধাজনক উপযুক্ত সময় বিবেচনা করেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের তড়িঘড়ি না করে বরং অত্যন্ত পরিপক্ব, দায়িত্বশীল ও সুদূরপ্রসারী আলোচনার মধ্য দিয়েই প্রতিটি বৈদেশিক সফরের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই দায়িত্বশীল কর্মকর্তা পরিষ্কার করে দেন।

ভারত ও বাংলাদেশের মতো দুটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার সুসম্পর্কের তাৎপর্য তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন যে যখনই দুই দেশের সরকারপ্রধান বা শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ একে অপরের মুখোমুখি বসেন কিংবা দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নেন, তখনই পারস্পরিক সম্পর্কের দীর্ঘদিনের জট খুলে অনেক অমীমাংসিত ও জটিল সমস্যার সুরাহা করার এক বিশাল সুযোগ তৈরি হয়। এদিক থেকে বিচার করলে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের উচিত হবে দুই দেশের এই পারস্পরিক সংলাপের সুযোগটিকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করা এবং এর সদ্ব্যবহার করা। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন সমস্যা, বাণিজ্য ঘাটতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের জনগণই উপকৃত হতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রতিমন্ত্রী মন্তব্য করেন যে আমাদের জাতির সাম্প্রতিক জুলাই অভ্যুত্থানের রক্তের দাগ এখনো পুরোপুরি শুকিয়ে যায়নি, দেশের মানুষের সেই ত্যাগের স্মৃতি এখনও অত্যন্ত তাজা ও জীবন্ত রয়েছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতার আলোকেই ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন এক উচ্চতায় উন্নীত করার এবং পারস্পরিক আস্থার সেতুবন্ধন তৈরির অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা ভারত সরকার সঠিক সময়ে সঠিকভাবে কাজে লাগাবে কি না, তা এখন সম্পূর্ণ তাদের নিজেদের ভেবে দেখার বিষয়।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য বিদেশ সফরগুলোর সূচি ও সময়সীমা সম্পর্কে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাওয়া হলে শামা ওবায়েদ জানান যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ঠিক কবে নাগাদ প্রতিবেশী দেশ ভারত কিংবা পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপান সফর করবেন, সেগুলোর কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে এবং উভয়ের উপযুক্ত ও পারস্পরিক সুবিধাজনক সময় নির্ধারিত হলেই কেবল এই সফরগুলোর আনুষ্ঠানিক দিনক্ষণ ঘোষণা করা হবে। তিনি আরও যোগ করেন যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড, নীতি নির্ধারণী বিষয় এবং প্রশাসনিক সংস্কারের কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন। দেশের অভ্যন্তরীণ সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনমুখী নীতি বাস্তবায়নে সরকার এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যার ফলে বৈদেশিক সফরের বিষয়টি বর্তমানে আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রয়েছে। যথাযথ কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই কেবল এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব হবে বলে তিনি পুনরায় মনে করিয়ে দেন।

বৈদেশিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার অন্যান্য ক্ষেত্রে সরকারের সফলতার কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সিঙ্গাপুরের সঙ্গে সাম্প্রতিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের ইতিবাচক দিকগুলো গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন। তিনি জানান যে সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ আরও প্রসারণ এবং দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষে সম্প্রতি সরকারি পর্যায়ে অত্যন্ত সফল ও ফলপ্রসূ কিছু বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ পরিবেশ সুরক্ষা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়নের অংশ হিসেবে সিঙ্গাপুরে আবর্জনা বা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদনের অত্যাধুনিক প্রকল্পগুলো তিনি নিজে সরেজমিন পরিদর্শন করে এসেছেন। এই ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ কীভাবে নিজেদের টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে পারে, সেই বিষয়েও কাজ চলছে বলে তিনি জানান। সব মিলিয়ে বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার অত্যন্ত পরিপক্বতা, বিচক্ষণতা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে, যা আগামী দিনে দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও বেশি সুদৃঢ় করবে বলে আশা করা হচ্ছে।