গুগলে বড় রদবদল, এআই দৌড়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার
গুগলে বড় রদবদল, এআই দৌড়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতা প্রতিদিন নতুন মোড় নিচ্ছে। ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রাসী অগ্রগতির মুখে নিজেদের একচ্ছত্র অবস্থান ও আধিপত্য ধরে রাখতে বড় ধরনের নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস করেছে প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল। বিশ্বখ্যাত বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই প্রযুক্তি বিশ্বে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। গুগলের ভেতরে থাকা এই হঠাৎ রদবদল প্রমাণ করে যে ভবিষ্যতের ডিজিটাল দুনিয়া কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা নিয়ে টেক জায়ান্টগুলোর মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চরমে পৌঁছেছে। প্রতিদ্বন্দীদের সঙ্গে ব্যবধান ঘুচিয়ে নিজেদের তৈরি জেমিনি মডেলকে সর্বেসর্বা করে তুলতে এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে গুগলের শীর্ষ নেতৃত্ব।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। এসব বৈঠকে তিনি গুগলের এআই গবেষক ও প্রকৌশলীদের আরও দ্রুত ও গতিশীলভাবে কাজ করার কঠোর তাগিদ দিয়েছেন। বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের নতুন ক্লড মিথোস মডেল এবং ওপেনএআইয়ের নিত্যনতুন চমকপ্রদ অগ্রগতির পর গুগল কর্তৃপক্ষ নিজেদের কৌশল নতুন করে সাজাতে বাধ্য হয়েছে। গত বছরের শেষের দিকে জেমিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাজারে কিছু সময়ের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী মডেলগুলোকে পেছনে ফেলতে সক্ষম হলেও, পরবর্তীতে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিযোগীদের তোপের মুখে পড়ে জেমিনি বেশ কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে, যা গুগলের নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
অভ্যন্তরীণ নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কোডিংসহ প্রযুক্তির বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে জেমিনির প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় দুর্বল পারফরম্যান্স ধরা পড়েছে। এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে জেমিনির বহুল প্রতীক্ষিত নতুন ফ্ল্যাগশিপ সংস্করণটি বাজারে উন্মোচন করার সময়সীমাও দুই মাস পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয় গুগল কর্তৃপক্ষ। প্রতিযোগিতার বাজারে নিজেদের সেরা পণ্যটি নামানোর আগে কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে নারাজ প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলীরা। মূলত এই প্রযুক্তিগত স্থবিরতা এবং ধীরগতির লাগাম টানতেই গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট গত আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে তাদের স্বনামধন্য এআই গবেষণা ইউনিট গুগল ডিপমাইন্ডে একটি আমূল ও নাটকীয় নেতৃত্ব পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে ডিপমাইন্ডের প্রধান ডেমিস হাসাবিস তাঁর দীর্ঘদিনের নির্বাহী দায়িত্ব থেকে কিছুটা সরে এসে চেয়ারম্যানের তুলনামূলক নমনীয় ও কৌশলগত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
ডেমিস হাসাবিসের স্থলাভিষিক্ত হয়ে নেতৃত্বের মূল চাবিকাঠি এখন হাতে তুলে নিয়েছেন তাঁরই দীর্ঘদিনের উপপ্রধান কোরে কাভুকচুওগলু। ডিপমাইন্ডের এই নেতৃত্ব পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বেশ কিছু সম্ভাবনাময় গবেষণা দল ও ইউনিটকে করপোরেট গুগলের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর ফলে ডিপমাইন্ডের পূর্বের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন অনেকটাই খর্ব হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্লেষকদের মতে, গুগলের মূল কাঠামোর সঙ্গে এআই গবেষণাকে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইতিপূর্বে ২০২৫ সালে গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই কোরে কাভুকচুওগলুকে প্রতিষ্ঠানের ‘চিফ এআই আর্কিটেক্ট’ বা প্রধান এআই স্থপতি হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন। সেই সময় থেকেই গুগলের বিভিন্ন বৈপ্লবিক পণ্যে এআই প্রযুক্তির সফল অন্তর্ভুক্তি এবং জেমিনির সামগ্রিক উন্নয়নে কাভুকচুওগলুর সরাসরি প্রভাব ও কর্তৃত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।
বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামোগত পরিবর্তনের পর থেকে গুগল ডিপমাইন্ডের যেকোনো বড় ও সুদূরপ্রসারী কৌশলগত সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত মতামত দেওয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতা এখন কোরে কাভুকচুওগলুর হাতেই ন্যস্ত করা হয়েছে। তবে এই রদবদলের ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গেই স্টক মার্কেটেও এর তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেখা যায়। ঘোষণার দিনেই বিশ্ববাজারে গুগলের শেয়ারের দাম প্রায় চার শতাংশের মতো কমে যায়, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা হলেও অস্থিরতার সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে ডেমিস হাসাবিস ও নতুন প্রধান কোরে কাভুকচুওগলু যৌথভাবে কর্মীদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হন। ওই বৈঠকে তাঁরা কর্মীদের আশ্বস্ত করে জানান যে দৈনন্দিন গবেষণার স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং সৃজনশীল পরিবেশ আগের মতোই নির্বিঘ্নে চলতে থাকবে। তবে জেমিনিকে বিশ্ববাজারে পুনরায় এআই প্রতিযোগিতার সর্বোচ্চ শিখরে ফিরিয়ে আনাই এখন পুরো প্রতিষ্ঠানের একমাত্র এবং প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে আরও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে বর্তমান সময়ে গুগলের সামনে সবচেয়ে বড় এবং প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলোর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত কম্পিউটিং সক্ষমতা বা হার্ডওয়্যারের ঘাটতি। এ ছাড়াও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতার সমস্যা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় নতুন ও আধুনিক মডেল বাজারে আনতে কিছুটা ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। গুগলের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টের জন্য এই সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে ওঠা একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বহুমুখী সংকট ও সীমাবদ্ধতাগুলো দ্রুত পেরিয়ে আসার লক্ষ্যেই মূলত গুগলের শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের পরিচালনা পর্ষদ ও সাংগঠনিক কাঠামোয় এই নাটকীয় পরিবর্তন এনেছে। যদিও রয়টার্সের পক্ষ থেকে সের্গেই ব্রিনের সাম্প্রতিক ভূমিকা, ডিপমাইন্ডের কাঠামোগত রদবদল কিংবা সাধারণ কর্মীদের বর্তমান উদ্বেগ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হয়নি গুগল কর্তৃপক্ষ। তবে প্রতিষ্ঠানটির নীতিগত অবস্থান থেকে পরিষ্কার যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই রমরমা বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে গুগল যেকোনো ধরনের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বিন্দুমাত্র পিছপা হবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত