প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব রাজনীতির জটিল মারপ্যাঁচ এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার আগুনে পুড়ছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাধারণ নাবিক ও নৌসেনাদের জীবন। সুদূর সমুদ্রের বুকে মাসের পর মাস মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হওয়া এবং মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত মার্কিন নৌসেনাদের চরম দুর্গতি ও দুর্দশার চিত্র এখন খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনেও বড়ো ধরনের নাড়া দিয়েছে। দীর্ঘ আড়াইশো দিনেরও বেশি সময় ধরে কোনো ধরনের বিরতি বা বন্দরে ভেড়ার সুযোগ না পেয়ে উত্তাল সাগরে ভাসতে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান বিমানবাহী শক্তিশালী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের নাবিকদের অবর্ণনীয় কষ্ট, কাজের চরম প্রতিকূল পরিবেশ এবং মানসিক অবসাদ নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রভাবশালী সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলুর প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্রে জানা গেছে, এই অমানবিক পরিস্থিতির জন্য সরাসরি মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং ভারপ্রাপ্ত নৌবাহিনী সচিব হাং কাওয়ের দপ্তরে কড়া ভাষায় জবাব চেয়ে একটি কঠোর চিঠি পাঠিয়েছেন ওই সিনেটর।
সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির অত্যন্ত প্রভাবশালী সদস্য রিচার্ড ব্লুমেনথাল গত বুধবার মার্কিন প্রশাসনের নীতি নির্ধারকদের কাছে পাঠানো ওই চিঠির মাধ্যমে রণতরীটির ভেতরের ভয়াবহ পরিস্থিতির বিস্তারিত তুলে ধরেন। তাঁর উত্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, সাগরে মোতায়েন থাকা ওই রণতরীটিতে বর্তমানে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক সরঞ্জামের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, জাহাজের ভেতরে ব্যবহৃত পানির চরম দূষণ, প্লাম্বিং বা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার মারাত্মক ত্রুটি, দীর্ঘ সময় সূর্যের আলো ও পরিবারের সংস্পর্শে না থাকার কারণে নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের হু হু করে অবনতি, জাহাজের ডেকে কাজ করার সময় নিত্যদিনের মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং এমনকি ডাকব্যবস্থায় বড় ধরনের নজিরবিহীন বিঘ্নের মতো মারাত্মক সব অভিযোগ সামনে এসেছে। এর ফলে আমেরিকা থেকে প্রিয়জনদের পাঠানো বহু কেয়ার প্যাকেজ বা প্রয়োজনীয় জরুরি সামগ্রী মাসের পর মাস সাগরে ঘুরপাক খেয়ে হারিয়ে যাচ্ছে, যা নিঃসঙ্গ নাবিকদের মানসিকভাবে আরও বেশি ভেঙে দিচ্ছে।

পরিস্থিতির গভীরতা কতটা মারাত্মক, তার বিবরণ দিতে গিয়ে সিনেটর ব্লুমেনথাল উল্লেখ করেন যে ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন নামের এই বিশাল রণতরীটি গত বছরের অর্থাৎ ২০২৫ সালের একুশে নভেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো নৌঘাঁটি থেকে নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল। সূচনার সময় মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে মাত্র সাত মাসের জন্য এই রণতরীটি সাগরে মোতায়েন রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং সে অনুযায়ী চলতি বছরের মে মাসের মধ্যে এর নিজ ঘাঁটিতে ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার অজুহাত দেখিয়ে এই মোতায়েনের মেয়াদ দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে এবং সবশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বর্তমান সময় পর্যন্ত এই রণতরীর সুনির্দিষ্টভাবে ফিরে আসার কোনো তারিখ বা দিনক্ষণ প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি। সিনেটর ব্লুমেনথালের তথ্যমতে, এই রণতরীটি টানা দুইশো দিনেরও বেশি সময় ধরে একটি বারের জন্যও কোনো বন্দরে নোঙর না ফেলে একটানা খোলা সাগরে অবস্থান করছে, যা সামরিক ইতিহাসে একটানা সমুদ্রে অবস্থানের ক্ষেত্রে একটি বিরল ও উদ্বেগজনক রেকর্ড তৈরি করেছে।
এই দীর্ঘমেয়াদি এবং অন্তহীন মোতায়েনের কারণে মার্কিন নৌবাহিনীর সামগ্রিক কাঠামোগত সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখন বহু গুরুতর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে বিমানবাহী রণতরীগুলোর ওপর অতিরিক্ত ও ক্রমবর্ধমান অভিযানের চাপ কীভাবে সামলানো হচ্ছে, সাগরে দিনের পর দিন কাটানো ক্লান্ত নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক কল্যাণ কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে, এবং জাহাজের যন্ত্রাংশের প্রস্তুতি বজায় রেখে নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা আদৌ সম্ভব কি না—তা নিয়েও তীব্র সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সিনেটর ব্লুমেনথাল জোরালো কণ্ঠে বলেছেন যে এই ধরনের সমস্ত গুরুতর অভিযোগ এবং অব্যবস্থাপনার ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে তিনি প্রশাসনের কাছে সরাসরি প্রশ্ন রেখেছেন যে মার্কিন নৌবাহিনীর এই বিমানবাহী রণতরীগুলোকে যে লাগাতার ও অতিরিক্ত মাত্রার সামরিক দায়িত্ব বা চাপ দেওয়া হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদে সেই অতিমাত্রার অভিযানিক গতি ও তৎপরতা বজায় রাখা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত কি না।
বর্তমান আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান তীব্র মার্কিন সামরিক উত্তেজনা এবং ওই সংবেদনশীল অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর সামরিক উপস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন একটি অত্যন্ত জটিল ও থমথমে পরিস্থিতিতে ইউএস লিঙ্কনের এই দীর্ঘতম মোতায়েনকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন ওই সিনেটর। প্রশাসন যদি ভবিষ্যতে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান বা ওই অঞ্চলে বিমানবাহী রণতরীর বাড়তি উপস্থিতি যেকোনো মূল্যে বজায় রাখতে চায়, তাহলে বর্তমানের অতিরিক্ত সামরিক চাহিদা কীভাবে মেটানো হবে এবং এর ফলে ভবিষ্যতে নৌবাহিনীর সামগ্রিক সামরিক প্রস্তুতিতে কোনো সংকট তৈরি হবে কি না—তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা সরকারকে দিতে হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। যুদ্ধ পরিস্থিতির ভয়াবহতা ছাড়াও দীর্ঘ সময় সাগরে মোতায়েন থাকলে বিমানবাহী রণতরীগুলোতে কর্মরত নাবিকদের কাজের অন্তর্নিহিত ও দৈনন্দিন ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, যা চরম বিপদের কারণ হতে পারে।

সিনেটর ব্লুমেনথাল তাঁর বক্তব্যে খুব স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন যে রণতরীর বদ্ধ ও উত্তাল পরিবেশে নাবিকদের প্রতিনিয়ত অত্যন্ত বিপজ্জনক সব উপাদানের মুখোমুখি হয়ে কাজ করতে হয়। তাঁদের অত্যন্ত কাছ থেকে জেট ইঞ্জিনের বিকট শব্দ ও ধোঁয়া, দাহ্য ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জ্বালানি, মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র, ভারী যন্ত্রপাতি এবং অত্যন্ত জটিল বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার আশপাশে সার্বক্ষণিক কাজ চালিয়ে যেতে হয়। এর পাশাপাশি শত্রু পক্ষের যেকোনো সম্ভাব্য হঠাৎ আক্রমণ বা ইউদ্ধের ঝুঁকির তো রয়েছেই, যা তাঁদের জীবনকে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এমতাবস্থায় মার্কিন সরকারের নীতিনির্ধারক মহল এবং পেন্টাগনের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরা যদি অতি দ্রুত এই নৌসেনাদের মৌলিক অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করেন, তবে তা মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভেতরেই এক গভীর নৈতিক ও কাঠামোগত সংকটের জন্ম দেবে বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সামরিক বিশেষজ্ঞরা।