প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হবিগঞ্জ জেলাজুড়ে গ্যাসের তীব্র সংকটে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে স্থানীয় শিল্প খাত। চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল গ্যাস সরবরাহের পর গত বুধবার থেকে জেলার অধিকাংশ শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি থমকে গেছে। হঠাৎ করে কারখানার চাকা চিরতরে থেমে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন লাখাধিক শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী। চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মানুষ। উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে এবং রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হবিগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। যার মধ্যে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান শতভাগ রপ্তানিমুখী এবং আরও কিছু প্রতিষ্ঠান আংশিকভাবে রপ্তানিমুখী। এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টের মাধ্যমে নিজেদের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাত। কিন্তু আকস্মিক গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বিদ্যুৎ ও উৎপাদন—উভয় দিক থেকেই চরম বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে কারখানাগুলো। গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই এই গ্যাস সংকট শুরু হয়েছিল। প্রথমদিকে চাহিদার তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হলেও কোনো রকমে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু বুধবার থেকে সরবরাহ একেবারেই শূন্যে নেমে আসায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আবুল হোসেন জানান, তাদের শিল্পপার্কে ছয়টি কারখানা রয়েছে যার মধ্যে টায়ার ও পাওয়ার প্লান্ট বাদে বাকি চারটি প্রতিষ্ঠানই শতভাগ রপ্তানিমুখী। এই পার্কে শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলে প্রায় ১২ হাজার মানুষ কর্মরত রয়েছেন। কারখানাগুলোর দৈনিক অনুমোদিত গ্যাসের চাহিদা ১৩ দশমিক ৪ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট হলেও বেশ কিছুদিন ধরে মাত্র ৩ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। এতে উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল এবং বুধবার রাত বারোটা থেকে সেই সরবরাহও পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্টার সিরামিকসের প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা পল্লব জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন ধরে চাহিদার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল, যা বুধবার দুপুর থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। সময়মতো পণ্য শিপমেন্ট বা সরবরাহ করা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এসএম স্পিনিংয়ের মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে সাড়ে তেরো হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজ করেন। বুধবার বিকেল পৌনে চারটা থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রতিদিনের নির্ধারিত ৩৮ হাজার মেট্রিক টন সুতা উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এতে দৈনিক প্রায় এক লাখ ২১ হাজার ৬০০ ডলার বা প্রায় দেড় কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। স্কয়ার ডেনিমের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ জানান, তাদের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২০ মেগাওয়াট হলেও বুধবার বিকেল তিনটা থেকে তা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে কারখানার প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ রপ্তানিমুখী হওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়া নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যথাসময়ে শিপমেন্ট না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন হবে এবং বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার দেব জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন। কয়েক দিন ধরে গ্যাস সংকট চললেও বুধবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে সরবরাহ একেবারে শূন্যে নেমে এসেছে। ফলে পুরো শিল্পপার্কের সব কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। হবিগঞ্জের স্থানীয় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ফরাস দেবনাথ বলেন, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় ঠিকমতো কাজ করা যাচ্ছিল না, আর এখন পুরোপুরি বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা কারখানায় এসে অলস সময় পার করছেন। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে তাদের পক্ষে আয়-রোজগার করা এবং সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এদিকে কিছু কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এখনো গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকায় একধরনের তীব্র অসন্তোষ ও বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, হবিগঞ্জের সব কারখানায় সমানভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা হয়নি। কিছু কম্পানিতে এখনো গ্যাস দেওয়া হচ্ছে, যা স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক। গ্যাস সংকট যদি জাতীয় সমস্যা হয়, তবে সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই নীতি প্রয়োগ করা উচিত। কোনো প্রতিষ্ঠান গ্যাস পাবে আর কোনো প্রতিষ্ঠান পাবে না—এ ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ সামগ্রিক শিল্প খাতের জন্য আরও বড় সংকট তৈরি করবে বলে মনে করেন তিনি।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ গ্যাস সরবরাহ কমানো বা বন্ধের বিষয়ে একাধিক চিঠি দিলেও সেখানে কোনো স্পষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী জানান যে গ্যাস সংকট একটি জাতীয় সমস্যা। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকেই এই সংকট শুরু হয়েছে এবং এ বিষয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান যে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর কারণে শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে কমাতে হয়েছে। তবে আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
শিল্প-কারখানাগুলো এভাবে বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, সার্বিক উৎপাদন, বৈদেশিক রপ্তানি আয় এবং বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা—সবকিছুই গভীর সংকটের মুখে পড়ছে। শ্রমিক-কর্মচারীদের পাশাপাশি শিল্প উদ্যোক্তারাও দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন। অনতিবিলম্বে এই সংকটের সমাধান না হলে হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে এক অপূরণীয় অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।