প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টানা কয়েক সপ্তাহের তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল—দুটিই এখন আবার গ্যাস সরবরাহ করছে। শনিবার সকালে সামিটের টার্মিনাল থেকে প্রায় ৪৬ কোটি ঘনফুট এবং এক্সিলারেট থেকে প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। এতে সার্বিক সরবরাহ বেড়ে প্রায় ২৪০ কোটি ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে বলে পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের স্বল্প সরবরাহে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন এবং আবাসিক গ্রাহকেরা ভোগান্তিতে রয়েছেন। কোথাও চুলায় গ্যাসের চাপ কম, কোথাও শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় সিএনজি স্টেশনেও সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দুই টার্মিনাল থেকে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়াকে সাময়িক স্বস্তির খবর হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখনও অনেক কম থাকায় সংকট পুরোপুরি কেটে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ থাকে প্রায় ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি থেকে প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ পাওয়ার কথা। ফলে শনিবার সরবরাহ ২৪০ কোটি ঘনফুটে উঠলেও চাহিদার তুলনায় ঘাটতি এখনও প্রায় ১৪০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি।
এই ঘাটতির কারণে গ্যাসের স্বল্প চাপের প্রভাব দেশের বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের ওপর পড়ছে। গৃহস্থালি গ্রাহকদের রান্নার সময় গ্যাস না পাওয়া বা কম চাপের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কারখানার যন্ত্রপাতি চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে গ্যাস সংকটের প্রভাব সরাসরি বিদ্যুৎ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপরও পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি সরবরাহের বিঘ্নে ঘরবাড়ি, শিল্প, পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
শুক্রবার বিকেলে কারিগরি সমস্যার কারণে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ দ্রুত কমে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। কয়েক ঘণ্টা পর পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়। মেরামত ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষে শুক্রবার রাতেই টার্মিনালটি থেকে আবার সীমিত পরিমাণে গ্যাস সরবরাহ শুরু করা হয়।
শনিবার সকালে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যাচ্ছে। অর্থাৎ টার্মিনালটি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও এর আংশিক কার্যক্রম চালু হওয়ায় জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিমাণ গ্যাস ফিরেছে।
এর আগে ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিদুর্ঘটনার পর বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হয়েছিল। ওই ঘটনার পর টার্মিনালটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রতিবেদনে তখন জানানো হয়, দুর্ঘটনার কারণে টার্মিনালের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ, নিয়ন্ত্রণ ও যন্ত্রপাতির অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালের অক্ষত অংশ ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে গ্যাস সরবরাহ ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৬ আগস্ট থেকে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে সীমিত পরিমাণে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছিল। কিন্তু শুক্রবার আবারও কারিগরি সমস্যায় সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট নতুন করে তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পরে রাতেই সরবরাহ পুনরায় শুরু হওয়ায় সেই চাপ কিছুটা কমেছে।
এক্সিলারেটের পাশাপাশি সামিটের টার্মিনাল নিয়েও গত কয়েক দিনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। বৈরী আবহাওয়া ও এলএনজি কার্গো সরবরাহের জটিলতার কারণে টার্মিনালে নতুন করে এলএনজি যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে মজুত থাকা এলএনজি ব্যবহার করেই কয়েক দিন জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ চালিয়ে যেতে হয়।
মজুত কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে সামিটের সরবরাহও ধাপে ধাপে কমানো হয়। প্রথমে সরবরাহ ২০ কোটি ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়। পরে তা আরও কমিয়ে প্রায় ১০ কোটি ঘনফুটে রাখা হয়। একপর্যায়ে বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে সামিটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
এতে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে। কারণ তখন একদিকে এক্সিলারেট টার্মিনাল সীমিত সক্ষমতায় চলছিল, অন্যদিকে সামিট থেকেও সরবরাহ বন্ধ ছিল। ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের জোগান দ্রুত কমে যায় এবং সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
শুক্রবার সন্ধ্যার পর সামিট আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু করে। শুরুতে সরবরাহের পরিমাণ ছিল তুলনামূলকভাবে কম। পরে রাতভর ধাপে ধাপে সরবরাহ বাড়ানো হয়। শনিবার সকালে সামিটের সরবরাহ প্রায় ৪৬ কোটি ঘনফুটে পৌঁছে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, টার্মিনালটির সরবরাহ আরও কিছুটা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ক্ষেত্রে মহেশখালীর দুটি ভাসমান স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি পরিচালনা করছে এক্সিলারেট এনার্জি এবং অন্যটি সামিট। এক্সিলারেটের টার্মিনালের দৈনিক সক্ষমতা প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট এবং সামিটের প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট।
দুটি টার্মিনালই একই সময়ে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু থাকলে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি থেকে বড় পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দুই টার্মিনালেই একের পর এক সমস্যা তৈরি হওয়ায় জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই সংকটের তীব্রতা বেড়েছিল।
এ কারণে শনিবার দুই টার্মিনাল থেকে একসঙ্গে প্রায় ৭৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও এই পরিমাণ দেশের মোট চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়, তবু সাম্প্রতিক নিম্ন সরবরাহের তুলনায় এটি বড় ধরনের উন্নতি।
দুই টার্মিনাল চালু হওয়ায় আপাতত গ্যাস সরবরাহের চাপ কিছুটা কমলেও সংকট পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে। বিশেষ করে এক্সিলারেটের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা সম্ভব হয়নি।
পেট্রোবাংলা সূত্র অনুযায়ী, এক্সিলারেটের টার্মিনালে দুটি বয়লার রয়েছে এবং প্রতিটির সক্ষমতা প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে একটি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি পুনরায় চালুর আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই করতে হবে। এ কাজের সময় টার্মিনাল থেকে প্রায় ৭২ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখার প্রয়োজন হতে পারে।
ফলে এখন যে সীমিত স্বস্তি তৈরি হয়েছে, সেই পরীক্ষা শুরু হলে আবারও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কবে ওই পরীক্ষা শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারিত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতি গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। দেশের মোট চাহিদা ও দেশীয় উৎপাদনের মধ্যকার ঘাটতি পূরণে এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে আমদানি করা এলএনজি বহনকারী জাহাজের সময়মতো আগমন, টার্মিনালের সক্ষমতা, আবহাওয়া, কারিগরি নিরাপত্তা এবং রিগ্যাসিফিকেশন ব্যবস্থার ওপর জাতীয় গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দৃষ্টিতে, দুই টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু না হওয়া পর্যন্ত দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিকে পুরোপুরি স্বাভাবিক বলা কঠিন। এর সঙ্গে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন, এলএনজি আমদানি এবং জাতীয় গ্রিডে সুষম বণ্টনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
শনিবারের পরিস্থিতি তাই একদিকে দীর্ঘ সংকটের মধ্যে কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে সামনে থাকা ঝুঁকির কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে। সামিটের সরবরাহ বেড়ে প্রায় ৪৬ কোটি এবং এক্সিলারেটের প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুটে ওঠায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ প্রায় ২৪০ কোটি ঘনফুটে পৌঁছেছে। কিন্তু দৈনিক চাহিদা যেখানে প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, সেখানে ঘাটতি এখনও বড়। ফলে ঘর থেকে কারখানা—সবখানে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হওয়ার জন্য গ্রাহকদের আরও কিছুটা অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এখন মূল নজর থাকবে এক্সিলারেটের ক্ষতিগ্রস্ত বয়লার পুরোপুরি সচল করা, সামিটের এলএনজি সরবরাহ ধারাবাহিক রাখা এবং দুই টার্মিনাল থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে পাঠানোর ওপর। এই তিনটি বিষয় সফলভাবে নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট থেকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার পথ তৈরি হতে পারে।