গ্যাস সংকটে আড়াইহাজারে সিএনজির ভাড়া দ্বিগুণ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার
গ্যাস সংকটে আড়াইহাজারে সিএনজির ভাড়া দ্বিগুণ

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬  । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে গ্যাস সংকটের প্রভাব এবার সরাসরি পড়েছে সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াত ব্যয়ে। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা এবং সরবরাহের সংকটের কারণে সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা কমে গেছে। এই সুযোগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এতে ক্ষোভ ও ভোগান্তি বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

স্থানীয় যাত্রীদের অভিযোগ, আড়াইহাজার-মদনপুর এবং ভুলতা-বিশনন্দী আঞ্চলিক মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে গত কয়েক দিন ধরে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। মদনপুর থেকে আড়াইহাজার পর্যন্ত স্বাভাবিক সময়ে যেখানে জনপ্রতি ভাড়া ৬০ টাকা, সেখানে এখন ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। একইভাবে মদনপুর থেকে বিশনন্দী ফেরিঘাট পর্যন্ত ৯০ টাকার নির্ধারিত ভাড়ার পরিবর্তে কোনো কোনো চালক ২০০ টাকা পর্যন্ত দাবি করছেন।

ফলে প্রতিদিন কর্মস্থল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে যাতায়াত করা মানুষকে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। যাদের প্রতিদিন এসব পথে যাতায়াত করতে হয়, তাদের ওপর অতিরিক্ত ভাড়ার চাপ আরও বেশি পড়ছে। স্বল্প আয়ের মানুষ ও চাকরিজীবীদের জন্য কয়েক দিনের এই বাড়তি ব্যয়ও মাসিক হিসাবের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।

শুক্রবার আড়াইহাজার-মদনপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। অনেক যাত্রী অভিযোগ করেন, চালকেরা আগে থেকেই নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা দাবি করছেন। কেউ আপত্তি জানালে তাকে গাড়িতে না ওঠার কথা বলা হচ্ছে। এতে যাত্রী ও চালকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। কোথাও বাগ্‌বিতণ্ডা, আবার কোথাও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মদনপুর থেকে বিশনন্দী ফেরিঘাটে যাতায়াতকারী আকলিমা আক্তারের অভিজ্ঞতাও এমনই। তিনি জানান, মদনপুর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠার পর গন্তব্যে পৌঁছে চালককে ২০০ টাকা দিতে হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চালক আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে ২০০ টাকার এক টাকা কম নেবেন না। যাত্রীকে ভাড়া মেনে নিতে হবে, না হলে অন্য কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা করতে হবে—এমন অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে।

নারায়ণগঞ্জে কর্মস্থলে যাতায়াতকারী জহিরুল ইসলাম বলেন, স্বাভাবিক সময়ে মদনপুর থেকে আড়াইহাজার পর্যন্ত সিএনজির ভাড়া ৬০ টাকা। মদনপুর থেকে বিশনন্দী ফেরিঘাটের ভাড়াও সাধারণত ৯০ টাকা। কিন্তু গত তিন-চার দিন ধরে হঠাৎ করেই ভাড়া বেড়ে গেছে। শুক্রবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে তিনি জানান। বাড়তি ভাড়া নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই চালকদের সঙ্গে যাত্রীদের বাগ্‌বিতণ্ডা হচ্ছে।

শুধু সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংকট নয়, স্থানীয়দের মতে, সড়কে যাত্রীবাহী বাসের চলাচলও তুলনামূলক কম থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে যাত্রীদের হাতে বিকল্প গণপরিবহন সীমিত হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষকে বাধ্য হয়ে সিএনজিতে উঠতে হচ্ছে এবং সেই সুযোগেই কোনো কোনো চালক অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

আড়াইহাজারে গ্যাস সংকট অবশ্য নতুন নয়। এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে উপজেলার শিল্পকারখানাগুলোতেও কম গ্যাসচাপের অভিযোগ ছিল। স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়েও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

সিএনজি অটোরিকশার চালকেরা বলছেন, বর্তমান বাড়তি ভাড়া তাদের ইচ্ছাকৃতভাবে নির্ধারণ করা নয়; গ্যাস সংগ্রহ করতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় ও খরচ হওয়ার কারণেই তারা ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন। চালকদের ভাষ্য, ফিলিং স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো কোনো স্টেশনে গাড়ি নিয়ে সকালে গেলে গ্যাস পেতে বিকেল হয়ে যাচ্ছে। আবার দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক সময় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এতে একদিকে তাদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হওয়ার সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে।

সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক নুরু মিয়া জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের সংকট চলছে এবং দিন দিন পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। সকালে গাড়ি নিয়ে ফিলিং স্টেশনে গেলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কখনো কখনো গ্যাস সংগ্রহ করতে গিয়ে দিনের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে। তার দাবি, এই পরিস্থিতিতে আগের ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করা চালকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে তিনি বাড়তি ভাড়াকে সাময়িক বলে উল্লেখ করেছেন।

গ্যাসের সংকটের কারণে শুধু আড়াইহাজার নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও সরবরাহের চাপ কমেছে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের সামগ্রিক সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক স্টেশনে দীর্ঘ সারি তৈরি হওয়ার খবর এসেছে। শিল্পাঞ্চল ও পরিবহন খাতের পাশাপাশি সাধারণ গ্রাহকরাও এর প্রভাব অনুভব করছেন।

তবে যাত্রীদের বক্তব্য, গ্যাসের সংকটের কারণে চালকদের সমস্যা থাকলেও তার পুরো দায় যাত্রীদের ওপর চাপানো গ্রহণযোগ্য নয়। নির্ধারিত ভাড়ার প্রায় দ্বিগুণ আদায় করলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ে। বিশেষ করে যারা প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াত করেন, তাদের জন্য প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫০ থেকে ১০০ টাকা ব্যয় করা মাস শেষে বড় আর্থিক চাপ তৈরি করে।

স্থানীয় কয়েকজন যাত্রী অভিযোগ করেছেন, ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে চালকদের ইচ্ছানির্ভর হয়ে উঠছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যাত্রীকে বলা হচ্ছে, বাড়তি ভাড়া দিতে না চাইলে গাড়িতে উঠতে হবে না। গণপরিবহনের স্বল্পতার কারণে তখন যাত্রীর সামনে বাস্তবে খুব বেশি বিকল্প থাকে না। ফলে অনেকেই প্রতিবাদ করেও শেষ পর্যন্ত দাবিকৃত ভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

এ অবস্থায় ভাড়া নির্ধারণ, সিএনজি সংকট এবং গণপরিবহনের স্বাভাবিক চলাচল—তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে দেখার দাবি উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে সিএনজি অটোরিকশার সংখ্যা বাড়তে পারে এবং অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার প্রবণতাও কমে আসতে পারে। একই সঙ্গে সড়কে পর্যাপ্ত বাস চলাচল নিশ্চিত করা গেলে কোনো একটি পরিবহনব্যবস্থার ওপর যাত্রীদের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও কমবে।

যাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা জানিয়েছেন আড়াইহাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভাড়া নিয়ে যাত্রী ও চালকদের মধ্যে বিরোধ আরও বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে যেখানে বাড়তি ভাড়া নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডা ও হাতাহাতির মতো ঘটনা ঘটছে, সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক নজরদারি জরুরি। একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহের প্রকৃত সংকট কতটা এবং কোথায় তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি—সেটিও নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

কারণ এই সংকটের প্রভাব শুধু একটি সিএনজি অটোরিকশার ভাড়ায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। একজন চাকরিজীবীর দৈনিক যাতায়াত ব্যয় বাড়ছে, শিক্ষার্থীর পরিবহন খরচ বাড়ছে, ছোট ব্যবসায়ীর চলাচলের খরচ বাড়ছে এবং পরিবারের মাসিক ব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে। একটি স্থানীয় পরিবহন সংকট তাই ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে।

আড়াইহাজারের যাত্রীরা এখন মূলত দুটি বিষয়ে দ্রুত সমাধান চান—সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধ করা। গ্যাসের সংকট সাময়িকভাবে সৃষ্টি হয়ে থাকলে তার দ্রুত সমাধান হলে পরিবহন পরিস্থিতিও স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ততদিন পর্যন্ত যাত্রীদের কাছ থেকে কত ভাড়া নেওয়া হবে, তা নিয়ে স্পষ্টতা ও কার্যকর নজরদারি না থাকলে ভোগান্তি আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, আড়াইহাজারে গ্যাস সংকট এখন শুধু জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা নয়; এর সরাসরি অভিঘাত পড়েছে মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে। সড়কে সিএনজি অটোরিকশার সংখ্যা কমে যাওয়া এবং বিকল্প পরিবহন সীমিত থাকায় যাত্রীরা বাড়তি ভাড়ার চাপে পড়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস মিলেছে। এখন স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ হবে এবং গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে সড়কের গণপরিবহন ব্যবস্থায়ও স্বস্তি ফিরবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত