প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীতে চলমান লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটের প্রতিবাদে মোমবাতি মিছিল করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত নিরসনের দাবিতে পৃথক বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার উত্তর বাড্ডা ও শান্তিনগর এলাকায় পৃথক এসব কর্মসূচিতে দুই দলের নেতারা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দ্রুত সমাধানের দাবি জানান।
জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার উদ্যোগে উত্তর বাড্ডায় আয়োজিত মোমবাতি মিছিলে দলটির নেতাকর্মীরা অংশ নেন। মিছিলের আগে ও পরে দেওয়া বক্তব্যে দলটির নেতারা চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের জন্য সরকারের ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তাদের অভিযোগ, সংকটের কারণে সাধারণ মানুষকে দিনের পর দিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এবং ঘরবাড়ি থেকে শিল্পকারখানা—সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
মিছিলে ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিমউদ্দিন বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তৈরি হয়নি; বরং সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণেই পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর বক্তব্যে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে। বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরে আলো জ্বালানোর জন্য মানুষকে মোমবাতির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে—এমন পরিস্থিতিকে তিনি সরকারের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি অবিলম্বে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলের বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত বা ‘হিডেন চার্জ’ বন্ধের দাবিও তোলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আরও বড় আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে জামায়াতের নেতাদের বক্তব্যে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিও উঠে আসে। ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ করিডোরের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মোহাম্মদ সেলিমউদ্দিন বলেন, দেশের মানুষ যখন বিদ্যুৎ সংকটে অন্ধকারে রয়েছে, তখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা নিশ্চিত না করে অন্য কোনো সিদ্ধান্ত জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তিনি মোমবাতি মিছিলকে শুধু প্রতীকী প্রতিবাদ নয়, বরং সরকারের প্রতি একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে তুলে ধরেন।
পরে জামায়াতের কয়েক হাজার নেতাকর্মী মোমবাতি জ্বালিয়ে মিছিল করেন। এ সময় তারা লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটের প্রতিবাদে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং সরকারের কাছে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি জানান। মিছিল ঘিরে উত্তর বাড্ডা এলাকায় কিছু সময়ের জন্য রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিবেশ তৈরি হয়।
কর্মসূচিতে জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার কর্মপরিষদ সদস্য ও অফিস সেক্রেটারি নাজিম উদ্দিন মোল্লা, মহানগরীর মজলিসে শূরা সদস্য কুতুবউদ্দিন, মিজানুর রহমান, অ্যাডভোকেট রেজাউল করিমসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
অন্যদিকে একই দিন রাজধানীর শান্তিনগর মোড়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে সিপিবি। পরে দলটির নেতাকর্মীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। সমাবেশে বক্তারা চলমান জ্বালানি সংকটকে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার জন্য গুরুতর সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন।
শান্তিনগর শাখার সভাপতি হযরত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দেন সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর মঈন, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ত্রিদিব সাহাসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
সমাবেশে সিপিবির নেতারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে। অথচ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া উদ্যোগ নিয়ে মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত আস্থা তৈরি হয়নি বলে তারা দাবি করেন।
সিপিবির নেতারা জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেন। তাদের বক্তব্যে দেশীয় জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান ও ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি করা এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর দাবি উঠে আসে। তারা মনে করেন, দেশের নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা শক্তিশালী না করে কেবল আমদানিনির্ভর ব্যবস্থা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন।
এ জন্য দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর পাশাপাশি পেট্রোবাংলা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি—বাপেক্স এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার দাবি জানান তারা। তাদের মতে, জ্বালানি খাতে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আমদানির ওপর চাপ কমবে এবং ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন, গ্যাসের সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সম্পর্ক সরাসরি। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বড় একটি অংশের উৎপাদন জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও তার প্রভাব পড়ে। সাম্প্রতিক সময়েও গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে লোডশেডিং বেড়েছিল। এতে একই সংকট একদিকে গ্যাসের স্বল্পতা এবং অন্যদিকে বিদ্যুতের ঘাটতি—দুইভাবেই মানুষের ওপর চাপ তৈরি করছে।
চলমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ নেই। শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকরাও কম চাপের সমস্যায় পড়ছেন। বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি তৈরি এবং কিছু স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার ঘটনাও ঘটেছে। গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাগুলো উৎপাদন সচল রাখতে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করায় তাদের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। এর ফলে জ্বালানি সংকটের প্রভাব ধীরে ধীরে বৃহত্তর অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হওয়ার তথ্য বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে এবং কয়েকটি সময়ে লোডশেডিংও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে গ্যাস সংকটে বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা ও সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দুর্ভোগ বাড়ে।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—বিদ্যুৎ ও গ্যাস এখন শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে। দিনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিদ্যুৎ না থাকা যেমন শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করছে, তেমনি গ্যাসের চাপ কম থাকায় রান্না থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয় ও সময়ের চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য এই সংকটের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। বিদ্যুৎ না থাকলে বিকল্প হিসেবে ব্যাটারি, চার্জার, ইনভার্টার বা অন্যান্য ব্যবস্থা করতে বাড়তি অর্থ ব্যয় হয়। গ্যাসের চাপ না থাকলে অনেক পরিবারকে এলপিজি, বৈদ্যুতিক চুলা বা অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে একটি জ্বালানি সংকট শেষ পর্যন্ত পরিবারের মাসিক ব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি করছে।
জামায়াত ও সিপিবির পৃথক কর্মসূচিতে সরকারের কাছে দ্রুত সংকট সমাধানের দাবি জানানো হলেও দুই দলের বক্তব্যে জোরের জায়গায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। জামায়াত তাৎক্ষণিকভাবে লোডশেডিং ও গ্যাস সংকট কমানো, অতিরিক্ত চার্জ বন্ধ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে সিপিবি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং এলএনজিনির্ভরতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
তবে উভয় পক্ষই একটি বিষয়ে একমত—বর্তমান সংকট দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে যেমন কঠিন করে তোলে, তেমনি শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
শুক্রবারের পৃথক দুই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাজধানীতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে রাজনৈতিক চাপও আরও দৃশ্যমান হলো। এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মসূচির বাইরে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা হবে। কারণ ঘরে আলো জ্বলা, রান্নার চুলা সচল থাকা, কারখানার উৎপাদন চালু রাখা এবং দেশের অর্থনীতির গতি বজায় রাখা—সবকিছুর সঙ্গে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের সম্পর্ক সরাসরি।