শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ২ বার
শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আজ ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। ৫১ বছর আগে সংঘটিত ওই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গভীর ও আলোচিত ঘটনা। রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে ভোররাতে সংঘটিত হামলায় শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেলসহ পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য নিহত হন। একই সময় রাজধানীর অন্য কয়েকটি স্থানে তার ঘনিষ্ঠ স্বজনদের ওপরও হামলা চালানো হয়।

বিদেশে অবস্থান করায় শেখ মুজিবুর রহমানের দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ওই হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যান। ১৫ আগস্টের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ওপর সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ছিল না; এর মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাজনৈতিক গতিপথে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। পরবর্তী কয়েক দশক ধরে এই দিনটি দেশের রাজনীতি, ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয়ের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অন্যতম প্রধান নেতা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়। ১৯৭১ সালের মার্চে পরিস্থিতি দ্রুত সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায় এবং ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযান শুরুর পর শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হন। তাকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে কারাবন্দি রাখা হয়।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার অনুপস্থিতিতেই বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে শপথ নেওয়া ওই সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ঘোষণা করা হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরে আসেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন, প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের মতো বড় চ্যালেঞ্জ তখন নতুন রাষ্ট্রটির সামনে ছিল।

দেশে ফিরে শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই সরকারব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে এবং তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। স্বাধীনতার প্রথম বছরগুলোতে তার সরকারকে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, খাদ্যসংকট, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো নানা সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়।

সময়ের সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনাও বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক বিরোধ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। একই সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সরকারের সম্পর্কও ক্রমে সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা হয়। সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা চালু করা হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশালকে কেন্দ্র করে একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের জন্ম দেয়।

সমর্থকদের একাংশ সে সময়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করলেও সমালোচকরা একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন। স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদ নিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাকশাল ব্যবস্থা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সংঘাত তৈরি করেছিল বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।

এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে সেনাবাহিনীর একদল সদস্যের অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন। ধানমন্ডির বাসভবনে হামলায় তার পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তাও নিহত হন। রাজধানীর অন্য এলাকায় শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় শেখ ফজলুল হক মনি ও তার স্ত্রী এবং আবদুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবারের কয়েকজন সদস্যও ওই দিনের হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। এরপর বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরু হয় একের পর এক পরিবর্তনের অধ্যায়। সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামোও বদলে যায়। একই বছরের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও সংকটপূর্ণ করে তোলে।

শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচার দীর্ঘ সময় আটকে ছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া নতুন গতি পায়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে কয়েকজন আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। তবে বিদেশে অবস্থানরত দণ্ডিত কয়েকজনের প্রত্যাবর্তন ও বিচারের বিষয়টি পরবর্তী সময়েও আলোচনায় ছিল।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তী সময়ে দিনটিতে সরকারি ছুটি, জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা, আলোচনা সভা, দোয়া ও শ্রদ্ধা নিবেদনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হতে থাকে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রীয় ক্যালেন্ডারে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে দিনটির রাষ্ট্রীয় মর্যাদাতেও পরিবর্তন আসে। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৫ আগস্টের সরকারি ছুটি বাতিল করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় ফেরার পর দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালনের পাশাপাশি সরকারি ছুটিও পুনর্বহাল করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় ও দলীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি পালিত হয়ে আসছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আবার বদলে যায়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ১৫ আগস্টের সাধারণ ছুটি বাতিল করা হয় এবং জাতীয় শোক দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের ধারাবাহিকতাও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে কয়েক দশক ধরে যে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে দিনটি পালিত হয়ে আসছিল, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার অবসান ঘটে।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। দলের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা দেশত্যাগ করেছেন, কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। এর ফলে ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে আগের মতো বড় পরিসরে দলীয় কর্মসূচি পালনের সুযোগও তৈরি হয়নি।

তবে শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থেমে নেই। একদিকে আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকদের কাছে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান নেতাদের একজন এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। অন্যদিকে তার শাসনামলের অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক বিরোধ, বাকশাল ব্যবস্থা ও একদলীয় শাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। ফলে তাকে ঘিরে মূল্যায়ন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

ইতিহাসের দৃষ্টিতে ১৫ আগস্টের গুরুত্ব শুধু হত্যাকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই ঘটনার আগে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন ছিল, কী কারণে রাষ্ট্রব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেনাবাহিনীর একাংশ কেন অভ্যুত্থানে জড়িয়েছিল এবং হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ কীভাবে বদলে গেল—এসব প্রশ্নও একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ।

৫১ বছর পর আজকের বাংলাদেশ সেই সময়ের বাংলাদেশ থেকে অনেকটাই ভিন্ন। রাষ্ট্রীয়ভাবে ১৫ আগস্টের আগের মর্যাদা নেই, রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলে গেছে। তবু ১৯৭৫ সালের ঘটনাটি দেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। সেই অধ্যায়কে বুঝতে হলে আবেগের পাশাপাশি তৎকালীন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক বাস্তবতা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও তার ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। স্বাধীনতার আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭৫ সালের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড—তার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

আজকের ১৫ আগস্ট তাই একদিকে একটি ঐতিহাসিক হত্যাকাণ্ডের ৫১ বছর পূর্তির দিন, অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসকে নতুন করে পর্যালোচনার একটি উপলক্ষ। সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক অবস্থান বদলালেও ১৯৭৫ সালের সেই ঘটনা এবং তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেশের ইতিহাস ও রাজনীতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত