প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামি চিন্তাবিদ ও মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এমন একজন ব্যক্তি, যিনি পৃথিবী থেকে চলে গেলেও মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন। আল্লামা সাঈদীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেন।
বিবৃতিতে ডা. শফিকুর রহমান আল্লামা সাঈদীর দীর্ঘ ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সাঈদী দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। শহরের বড় মঞ্চ থেকে শুরু করে গ্রামের সাধারণ মানুষের জমায়েত—বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি কোরআন ও ইসলামের শিক্ষা মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন।
শফিকুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্মীয় আলোচনার পাশাপাশি দেশের মানুষের সঙ্গে সাঈদীর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দিয়েছিল। তার বক্তব্য শুনতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের সমাগম হতো। পরবর্তী সময়ে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানেও তিনি ইসলামি চিন্তা ও কোরআনের তাফসির নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
আল্লামা সাঈদীর রাজনৈতিক জীবনও বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি আলোচিত অধ্যায়। ধর্মীয় বক্তা হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর তিনি জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদে দায়িত্ব পালনের সময় ধর্মীয় মূল্যবোধ, শিক্ষা এবং সাধারণ মানুষের বিভিন্ন দাবি ও সমস্যার বিষয়ে বক্তব্য রাখার কথা স্মরণ করেন জামায়াতের আমির।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মানুষের ভালোবাসাই সাঈদীকে তাফসিরের ময়দান থেকে জাতীয় সংসদে নিয়ে গিয়েছিল। সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা এবং সাধারণ মানুষের বিভিন্ন দাবি নিয়ে কথা বলেছেন।
সাঈদীর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়াও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১৩ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে আপিল বিভাগ সেই সাজা পরিবর্তন করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। তিনি কারাগারে থাকা অবস্থায় ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
সাঈদীর বিচার ও কারাবন্দিত্বের সময় তার সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। তার অনুসারীরা অভিযোগ করে আসছিলেন, তাকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করা হয়েছে। অন্যদিকে বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে সাক্ষ্য ও প্রমাণ উপস্থাপন করেছিল। ফলে সাঈদীকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র মতপার্থক্য রয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান তার বিবৃতিতে সাঈদীর ওপর নির্যাতনের অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যুগে যুগে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ওপর জুলুম ও নির্যাতন নেমে এসেছে এবং সাঈদীর জীবনেও এমন পরিস্থিতি এসেছিল বলে তিনি মনে করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাঈদীর প্রতি ভালোবাসা এবং তার ওপর কথিত জুলুমের প্রতিবাদে বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন।
সাঈদীকে ঘিরে ২০১৩ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছিল। তার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এসব ঘটনায় প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও ঘটে। সাঈদীর সমর্থকদের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বিভিন্ন স্থানে।
জামায়াতের আমিরের বিবৃতিতে এসব ঘটনাকে সাঈদীর প্রতি মানুষের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হলেও মানুষের হৃদয় থেকে সাঈদীর প্রতি ভালোবাসা মুছে ফেলা যায়নি।
আল্লামা সাঈদীর ধর্মীয় বক্তা হিসেবে জনপ্রিয়তা বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়েও বিস্তৃত হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি কোরআনের তাফসির, ইসলামি জীবনব্যবস্থা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তার বক্তব্যের মাধ্যমে বহু মানুষ ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি আগ্রহী হয়েছেন বলে তার অনুসারীদের দাবি।
তবে তার রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্য নিয়ে সমালোচনাও ছিল। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা তাকে দেশের রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত করে। ফলে সাঈদীকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বক্তা, রাজনৈতিক নেতা এবং ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তি—এই তিনটি পরিচয়ই বাংলাদেশের জনপরিসরে আলোচনায় এসেছে।
তার মৃত্যু ২০২৩ সালের আগস্টে হলেও জামায়াতে ইসলামী ও তার অনুসারীদের কাছে সাঈদীর স্মৃতি এখনও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দলীয় নেতাকর্মী ও অনুসারীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাকে স্মরণ করে নানা ধরনের বক্তব্য ও স্মৃতিচারণ দেখা যায়।
ডা. শফিকুর রহমানের এবারের বক্তব্যেও সাঈদীর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিই প্রধান হয়ে উঠেছে। তিনি সাঈদীর দীর্ঘ কর্মজীবন, মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ এবং ধর্মীয় দাওয়াতের কথা তুলে ধরে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
একই সঙ্গে সাঈদীকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিতর্কও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তার সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা ও ধর্মীয় নেতা। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকা নিয়ে আনা অভিযোগ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক সিদ্ধান্ত তার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে আছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে সমর্থন ও বিরোধিতা—দুই ধরনের অবস্থানই দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। আল্লামা সাঈদীর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তার বক্তব্য, রাজনৈতিক ভূমিকা, বিচার এবং কারাবন্দিত্বকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক তার মৃত্যুর পরও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় ফিরে আসে।
মৃত্যুর কয়েক বছর পরও জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যে সাঈদীর স্মৃতি ফিরে আসা থেকে বোঝা যায়, দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছে তিনি এখনও গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। বিশেষ করে তার ধর্মীয় বক্তৃতা ও তাফসিরের মাধ্যমে তৈরি হওয়া জনপ্রিয়তা তাকে জামায়াতের বাইরেও একটি বড় শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পরিচিত করেছিল।
ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মৃত্যুবার্ষিকীতে আবারও সাঈদীর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা সামনে এসেছে। তবে তার জীবন ও ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সমর্থকদের আবেগের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিচারিক ইতিহাস এবং বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ২০২৩ সালে মৃত্যুবরণ করলেও তার নাম বাংলাদেশের রাজনীতি ও ধর্মীয় পরিসরে এখনও আলোচিত। তার অনুসারীদের কাছে তিনি একজন প্রিয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব; আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি একই সঙ্গে একজন আলোচিত জামায়াত নেতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ফলে তাকে ঘিরে আলোচনা যেমন আবেগনির্ভর, তেমনি দেশের ইতিহাস ও রাজনীতির নানা বিতর্কের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত।